[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারালেন আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নরুল্লাহ শাওন ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের কবলে পড়ার পর গতকাল রাতে লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পুলিশ সুপার কার্যালয় ঘেরাও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। শনিবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের দুই শিক্ষার্থী ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বেড়াতে গিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’–এর কবলে পড়েছিলেন। প্রাণ বাঁচাতে ব্রহ্মপুত্র নদ সাঁতরে একজন তীরে ফিরতে পারলেও অন্যজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ময়মনসিংহে কিশোর অপরাধীদের অপতৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নাগরিক সমাজ এসব অপরাধ রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

মারা যাওয়া শিক্ষার্থীর নাম নুরুল্লাহ শাওন (২৬)। তিনি আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের চর জাকালিয়া গ্রামে।

গত বুধবার বিকেলে জয়নুল আবেদিন উদ্যান এলাকা থেকে নুরুল্লাহ শাওন ও তাঁর বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের ওপাড়ে বেড়াতে যান। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সাতজনের একদল কিশোর তাঁদের দুজনকে ঘিরে ধরে সঙ্গে যা আছে সব দিয়ে দিতে বলে। তাঁদের কাছে নৌকাভাড়া ছাড়া কোনো টাকা নেই জানালে দুজনকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে নুরুল্লাহ প্রতিবাদ করলে তাঁকে বেদম মারধর শুরু করে তারা। তখন দুই বন্ধু দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। চারজন শাওনের এবং তিনজন মঞ্জুরুলের পিছু নেয়। মঞ্জুরুল নদে নেমে সাঁতরে পার হতে পারলেও নুরুল্লাহ নিখোঁজ ছিলেন। পরে গতকাল রাতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত নুরুল্লাহর মা সাহিদা বেগম কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অভিযোগ করেন। সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন-চারজনকে আসামি করে দেওয়া অভিযোগটি সন্ধ্যায় মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ। অভিযুক্ত কিশোরদের সবার বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তারা নগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং চর জেলখানা বিন পাড়া এলাকার বাসিন্দা। অভিযুক্ত সাতজনই বিন সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের ধাওয়ায় নিখোঁজ কলেজছাত্রের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল রাত থেকেই ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নগরের টাউন হল এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে তাঁরা অবরোধ তুলে নেন।

আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক তানজিল আহমেদ বলেন, শহরকে ছিনতাই ও মাদকমুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এর আগে গত ৩ জানুয়ারি নগরের জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত নিলয় তালুকদারকে (১৫) ছুরিকাঘাত করে তারই সহপাঠীরা। ‘কিশোর গ্যাং’–এ যোগ না দেওয়ায় স্কুল বন্ধের দিন তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিঠে, হাতে, কোমর ও পায়ে অন্তত সাতটি ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনায় ১০ জানুয়ারি কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন মিফতাহুলের বাবা। মামলায় চারজনের নামসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়। আসামিরা সবাই জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির দিবা শাখার (ডে শিফট) শিক্ষার্থী।

মিফতাহুলের বাবা সাদেকুল ইসলাম তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর ছেলেকে ডেকে নিয়ে স্কুলের ভেতরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়। যারা এ কাজ করেছে তারা সবাই মাদকাসক্ত। মিফতাহুল তাদের দলে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় এই হামলা চালানো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ‘গ্যাং কালচারে’ জড়িয়ে পড়ছে। তারা মাদকের পাশাপাশি মারধর ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে। কিন্তু এসব রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কিশোর দলটি তাদের এলাকায় সন্ধ্যার দিকে ঘুরতে আসা মানুষদের আটকে ভয়ভীতি দেখাত। তারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর থেকে দলটির সদস্যদের পাওয়া যাচ্ছে না। তারা মুঠোফোন ব্যবহার করে না এবং তাদের পরিবারগুলোও অত্যন্ত দরিদ্র। একজনকে ধরে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদের ধরতে পারলে আসলে কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত জানা যাবে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মরদেহের প্রাথমিক তদন্তে (সুরতহাল) নিহত শিক্ষার্থীর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাইনি। পানিতে পড়ে গেলে শরীরে যেসব চিহ্ন থাকে, সাধারণত সেগুলোই পাওয়া গেছে। আমাদের ধারণা, পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কিশোর দলটির প্ররোচনা রয়েছে। ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তারা ধাওয়া না করলে এমন ঘটনা ঘটত না।’

কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘তারা একজনের নির্দেশে চলে এবং কোথাও গেলে দল বেঁধে যায়। তাদের কেউ কেউ মাদক সেবনের সঙ্গেও জড়িত। তবে সবাই যে কারও আশ্রয়ে (শেল্টার) চলে, তা নয়। এদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই তাদের খুব সতর্কভাবে সামলাতে হয়। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী ও মাদকের দৌরাত্ম্য নিয়ে নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা দায়ী। কঠোরভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন