[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মাতৃভাষায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত পাহাড়ের শিশুরা

২০১৭ সাল থেকে শিশুদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষক না থাকায় ৯ বছরেও পাঠদান শুরু হয়নি।
প্রকাশঃ
অ+ অ-
বিদ্যালয়ে মারমা ভাষার বই পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি বান্দরবানের গংজক হেডম্যান পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

বান্দরবান সদর উপজেলার ক্যমলংপাড়ার অংমেচিং মারমার মেয়ে দনুচিং মারমা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। শিশু শ্রেণি থেকেই তাকে মাতৃভাষায় পড়াতে চেয়েছিলেন মা। বিদ্যালয় থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষার পাঠ্যবইও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাঠদান করার মতো শিক্ষক নেই। ফলে পাঠ্যবইগুলো বাড়িতেই অলস পড়ে আছে।

অংমোচিং মারমা বলেন, ‘খুব ইচ্ছা ছিল মেয়ে মারমা ভাষায় পড়তে ও লিখতে শিখবে। বই দেওয়া হলেও শিক্ষকেরা নিজেরাই পড়াতে পারেন না। তাই মাতৃভাষায় পড়াও হচ্ছে না।’

কেবল দনুচিং মারমা নয়, তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কোনো শিশুই এখন পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পায়নি। ঘরে পাঠ্যপুস্তক থাকলেও সেই বই পড়ানোর মতো শিক্ষক নেই। অভিভাবকেরা চাইলেও বর্ণমালা না চেনায় শিশুরা পড়তে পারছে না। ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া শুরু হলেও গত ৯ বছরেও এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার পাঠ্যবইয়ে পাঠদান চালু করতে না পারা প্রসঙ্গে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকেরা মূলধারার সাধারণ শিক্ষার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষিত। তাঁরা মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষায় তৈরি পাঠ্যবই পড়তে পারেন না। হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষক নিজের ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে পাঠদান করার মতো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ তাঁদের নেই। কিছু মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষককে জেলা পরিষদ থেকে এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন নিজ ভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি পর্যাপ্ত না হওয়ায় পাঠদানে কোনো উন্নতি হয়নি।

আমার বিদ্যালয়ে মারমা শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে এবং মারমা শিক্ষকেরা পাঠদান করেন। শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। এ জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিশুরা মাতৃভাষায় পড়তে পারছে না।

মংচিং অং মারমা, প্রধান শিক্ষক, কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রোয়াংছড়ি উপজেলা।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মতে, পাঠদান সফল করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার মাধ্যমে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এরপরই কেবল মাতৃভাষার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি জনসংখ্যার বিন্যাস জরিপ (কোন জনগোষ্ঠীর বসবাস কোথায় বেশি বা কম), বিদ্যালয়ের অবকাঠামো অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ সাজানো এবং শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষকেরা জানান, এসব প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ না হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাহাড় ও সমতলের তিনটি করে মোট ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যবই তৈরি করেছে। ২০১৭ সাল থেকে তিন পার্বত্য জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণির চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিশুদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলায় চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তিন জনগোষ্ঠীর ৬৬ হাজার ৬৮৭ শিশুকে মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা শিশু ৩৫ হাজার ১৪৫ জন, মারমা ১৮ হাজার ৫১৩ জন এবং ত্রিপুরা ১২ হাজার ৭৫৬ জন। শিক্ষকেরা জানালেন, এ বছর শিশু শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সপ্তাহে চার দিন একটি করে বিষয়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে (ক্লাস রুটিন) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মারমা ভাষায় লেখা একটি বই। তবে শিক্ষক না থাকায় এসব বই বিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে না। সম্প্রতি বান্দরবান জেলা সদরের উজানী পাড়া এলাকা থেকে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

তৃতীয় শ্রেণির জন্য পাঠ্যসূচিতে (রুটিন) সপ্তাহে মাত্র এক দিন একটি বিষয় রাখা হয়েছে। লামা পৌরসভার নুনারবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদ সরোয়ার বলেন, রুটিনে রাখা হলেও পাঠদান কীভাবে হবে বা কারা করবেন, তা জানানো হয়নি। ফলে রুটিনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কার্যত কোনো উন্নতি হয়নি।

রোয়াংছড়ি উপজেলার কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংচিং অং মারমা জানিয়েছেন, ‘আমার বিদ্যালয়ের এলাকায় মারমা ছাড়া অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর বসবাস নেই। বিদ্যালয়েও শুধু মারমা শিক্ষার্থীরাই পড়াশোনা করে এবং মারমা শিক্ষকেরাই সেখানে পড়ান। কিন্তু শিক্ষকেরা নিজের ভাষায় লিখতে বা পড়তে পারেন না। এ কারণে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষা নিতে পারছে না।’

বান্দরবানের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিণয় চাকমা জানিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত। মূলধারার সাধারণ শিক্ষাসহ মাতৃভাষায় শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিকল্পনা নিয়ে জেলা পরিষদগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ বিষয়। তবে এবার মাতৃভাষায় পাঠদান রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করা এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, কাজ শুরু হয়েছে এবং এভাবেই ধীরে ধীরে উন্নতি হবে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন