চট্টগ্রামে এলপিজি গ্যাসের বাজারে অস্বস্তি, বাড়তি দামের চাপে ক্রেতারা
![]() |
| এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ বাড়লেও দাম এখনো কমেনি। রোববার বিকেল চারটায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
চট্টগ্রামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও দাম কমেনি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোথাও কোথাও লাইনের গ্যাসও সারা দিন থাকছে না। ফলে শহরের অনেক পরিবার বাড়তি খরচের চাপে পড়েছে।
নগরের ষোলশহর, ২ নম্বর গেট, চকবাজার, আতুরার ডিপো ও টেকনিক্যাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় দোকানে সিলিন্ডারের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম এখনো চড়া।
টেকনিক্যাল এলাকার বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদিয়া ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক সিলিন্ডারের চাহিদা থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুহাম্মদ আলী আজম জানান, ১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছ থেকে তাঁকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তিনি বিক্রি করছেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তাঁর দাবি, নির্ধারিত দামে কোথাও গ্যাস বিক্রি হচ্ছে না। পরিবেশক পর্যায়ে দাম না কমলে খুচরা পর্যায়ে কমানো সম্ভব নয়।
দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। এই বাজারটি পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। নিবন্ধিত ৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩২টির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। ২৩টি প্রতিষ্ঠানের আমদানির সক্ষমতা থাকলেও গত বছর কোনো না কোনো মাসে ১৭টি কোম্পানি আমদানি করেছে। তবে নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের শুরুতে কয়েকটি কোম্পানি আমদানি করলেও শেষ দিকে অনেকেই তা কমিয়ে দেয়। সেই ঘাটতির প্রভাব বাজারে পড়ায় হঠাৎ সংকটে পড়েন গ্রাহকেরা। এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, শহরে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি আছে। তাঁর দাবি, সরবরাহ বাড়লেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে বাড়তি দাম নিচ্ছেন।
তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সমস্যা কেবল সুযোগসন্ধানীদের নয়। অনেক দোকানে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদার তুলনায় কম। ফলে দরদামের সুযোগ থাকে না। ক্রেতা বেশি আর পণ্য কম—এই বাস্তবতায় বাড়তি দাম যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
নগরের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার সমবায় আবাসিক এলাকার ভাড়াটিয়া তৌফিক ইসলাম বলেন, ‘গত শনিবার ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। দোকানে সিলিন্ডার ছিল অল্প, তাই দাম কমানোর কথা বলার সুযোগই পাইনি।’
আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর ও জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০ জন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সবাইকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি।
নন্দনকানন এলাকার একটি ভবনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, তাঁদের ১৮টি ফ্ল্যাটে লাইনের গ্যাস নেই। প্রতিদিন তিন-চারটি সিলিন্ডার খালি হয়। সবাই বাড়তি দামে কিনছেন, আবার কখনো পাওয়াই যাচ্ছে না। আগ্রাবাদের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বাসার পাশে সিলিন্ডার না পেয়ে এক কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে কিনেছেন। ১২ কেজির সিলিন্ডারে তাঁকেও ২০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
এলপিজির খুচরা দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী সরকার দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হচ্ছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়া হলেও নজরদারি কোথায়—সেই প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তার প্রভাব স্থায়ী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দোকানিরাও স্বস্তিতে নেই। ক্রেতার চাপ ও পরিবেশকের বাড়তি দর—এই দুইয়ের মাঝে পড়েছেন তাঁরা। ষোলশহর এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘ক্রেতারা মনে করেন আমরা বেশি নিচ্ছি, কিন্তু পরিবেশকের কাছ থেকেই আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’
বিভিন্ন এলাকার পাঁচজন খুচরা বিক্রেতা জানান, যে পরিমাণ সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে দোকান ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। মুনাফা কমলেও বাড়তি দাম রাখার দায় তাঁদের ওপরেই পড়ছে। পরিবেশক প্রতিষ্ঠান আলী অ্যান্ড সন্সের মালিক আয়ুব আলী চৌধুরী বলেন, আমদানি কম হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে খরচ ওঠে না বলেই অনেকে বাড়তি দাম রাখছেন। তবে তাঁর দাবি, বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং ১০ রোজার মধ্যেই দাম কমে আসবে।

Comments
Comments