[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের জন্য কী করে গেল, জানতে চান গুমের ভুক্তভোগীরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং গুম হয়ে ফেরত আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টার বৈঠক। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিলিয়া মিলনায়তনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

এক সপ্তাহ পর (১২ ফেব্রুয়ারি) হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিদায় নিতে যাচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া এই সরকার গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য কী করল, সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে তা জানতে চাইলেন ভুক্তভোগী স্বজনেরা। জবাবে সরকারের এক উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচার শুরু করেছে। গুম বন্ধে শক্ত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ম তৈরির মাধ্যমে গুমের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। এসব নিয়মে বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন এবং গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টার এক লবি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মুঠোফোনে যুক্ত হন। আর সরাসরি উপস্থিত ছিলেন শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ইনস্টিটিউট (বিলিয়া) মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এই বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের জন্য নেওয়া সরকারি পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়।

মুঠোফোনে বক্তব্যে আইন উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য শেষে কথা বলেন ২০১১ সালে বাগেরহাট থেকে গুম হওয়া হাবিবের মেয়ে জেসমিন। একপর্যায়ে উপদেষ্টা তাঁকে বলেন, ‘আপনাকে কথা দিলাম, আদিল ভাই, আমি, এলান, রিজওয়ানা—আমাদের আপনারা সরকার থেকে চলে যাওয়ার পর আরও ১০ গুণ বেশি পাশে পাবেন। আমরা সব সময় আপনাদের সাথে থাকব।’

জেসমিনের পর আসিফ নজরুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ২০১৯ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি। তিনি প্রশ্ন করেন, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা কীভাবে দেশের বাইরে চলে গেলেন? গুমের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা এখনো কীভাবে পদোন্নতিসহ চাকরিতে বহাল আছেন? জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘অন্য মন্ত্রণালয়ের জবাব আমি দিতে পারব না। গুমের বিচারের জন্য আমরা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। আপনার অভিযোগ অনেক বেশি সত্য। তবে এ নিয়ে যখন আমাদের সংগ্রাম চলবে, তখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা আপনাদের পাশেই থাকব। তখন আমরা আরও অনেক কথা বলতে পারব।’

বিগত সরকারের আমলের অপরাধীরা এখনো কীভাবে কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন পান, সেই প্রশ্নও করেন নাসরীন জাহান। জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন পেয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে এই অভিযোগ গত পরশুও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ করেছে যে আমরা জামিন দিই না, আমাদের সরকার জামিন দেওয়ার ব্যাপারে খুব কঠোর। এখন অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) জামিন হয়। উচ্চ আদালতের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এটি প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে। সেখানকার কোনো কিছুর জবাব আমি দিতে পারব না।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১২ সালে গুমের শিকার হয়েছিলেন বরিশালের বিএনপি নেতা ফিরোজ খান ও তাঁর ভাই। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা ফিরোজের স্ত্রী আমেনা আক্তার (বৃষ্টি) বৈঠকে অভিযোগ করেন, গুম হওয়া পরিবারগুলো কেমন আছে, অন্তর্বর্তী সরকার সেই খবর নেয়নি। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের মতো পরিবারগুলোর জন্য কী করে গেল? যদি বিশেষ কিছু করতে না-ও পারে, তবে পরের সরকার যেন আমাদের পাশে থাকে, অন্তত সেই ব্যবস্থাটুকু করে যান।’

বৈঠকে অংশ নিয়ে গুম হওয়ার পর ফিরে আসা সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিলিয়ার পরিচালক এম মারুফ জামান, শিক্ষক ইকবাল চৌধুরী ও রহমত উল্লাহ তাঁদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। বক্তব্য দেন গুম থেকে ফিরে আসা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল হাসিনুর রহমানও। তাঁদের কথায় গুমের কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি আর্থিক বিপর্যয়ের বিষয়টি উঠে আসে। তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঠিক ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পরে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে (কনভেনশন) যুক্ত হয়েছি। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার শুরু হয়েছে।’

সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা আরও জানান, গুম ঠেকাতে ও এর প্রতিকারে নতুন অধ্যাদেশ তৈরির পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও সই করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে মানবাধিকার অধ্যাদেশে একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা আইন করেছি এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজও শেষ করেছি। আশা করছি, আগামী তিন–চার দিনের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হবে। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন। আমাদের তৈরি করা নিয়ম ও ব্যবস্থাগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। গুম একটি জঘন্য অপরাধ। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান ছিল কঠোর। আমরা গুমের বিরুদ্ধে যে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছি, পরবর্তী সরকারগুলো তা অবশ্যই বজায় রাখবে। বাংলাদেশ থেকে গুম চিরতরে মুছে ফেলা হবে। আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে ফিরে গিয়েও গুমের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখব।’

বৈঠকের শেষে বক্তব্য দেন উপদেষ্টা ও মানবাধিকার সংগঠন অধিকার- এর প্রতিষ্ঠাতা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা আমার আপনজন। তাঁরা একটি ট্রাস্ট ফান্ড (সহায়তা তহবিল) গঠনের কথা বলেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যাঁরা গঠন করবেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’

আদিলুর রহমান আরও বলেন, ‘গুমের বিচারের পথে অনেক চ্যালেঞ্জ ও বাধা ছিল। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই কাজ এগিয়ে নিয়েছে। গুম কমিশন তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে বড় সহযোগিতা করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এই লড়াই শেষ হওয়ার নয়; এটি চলবে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গুমের ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে।

বৈঠকটি পরিচালনা করেন সংগঠনের পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান। সংগঠনের আরেক পরিচালক তাসলিম ফাহমিনা গুম বিষয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। বৈঠকে গুম কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেনও বক্তব্য দেন।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন