[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

তিনজনকে গলা কেটে হত্যা: মণিপুর গ্রামে আতঙ্ক-থমথমে পরিস্থিতি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মা, একমাত্র ভাই ও চাচাতো ভাইকে হারিয়ে বিলাপ করছেন দুই বোন সুমাইয়া আর জিনিয়া। আশপাশের লোকজনও কাঁদছেন। মঙ্গলবার দুপুরে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ঘারমোড়া ইউনিয়নের মণিপুর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

মঙ্গলবার বেলা দেড়টা। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ঘারমোড়া ইউনিয়নের মণিপুর গ্রামে ঢুকতেই থমথমে পরিস্থিতি চোখে পড়ল। চারদিকে মানুষের মুখে আতঙ্কের ছাপ। কারণ, সেদিন সকালে এই গ্রামের জয়নুন্দিন মুন্সির বাড়িতে একটি ঘরে পাওয়া গেছে এক প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই শিশুর গলাকাটা লাশ। দুই শিশুর মধ্যে একজন ওই নারীর নিজের সন্তান, অন্যজন তাঁর দেবরের ছেলে। এ ঘটনায় পুরো গ্রামবাসী হতবাক। ঘটনার নেপথ্যে কারা জড়িত, তা এখনো অজানা। পুলিশ বলছে, খুনিদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করেছে তারা।

সেদিন সকালে ঘরের ভেতরে তিনজনকে হত্যার বিষয়টি টের পান স্থানীয় মানুষেরা। খবর পেয়ে সকাল ১০টার দিকে পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এরপর অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশ তদন্ত ব্যুরোর সদস্যরা আসেন আলামত সংগ্রহে। সব প্রক্রিয়া শেষে নিহত তিনজনের মরদেহ মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায় পুলিশ। পুলিশের ধারণা, সোমবার গভীর রাতে কোনো এক সময় দুই শিশুসহ তিনজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন সৌদিপ্রবাসী জহিরুল ইসলামের স্ত্রী সুখিয়া বেগম ওরফে পাপিয়া (৩৫), তাঁদের একমাত্র ছেলে মো. হুসাইন (৪) এবং জহিরুল ইসলামের ছোট ভাই আবদুস সাত্তারের ছেলে মো. জুবাইদ হোসেন (৫)। ঘটনার সময় ওই প্রবাসীর ঘরের আলমারি ভেঙে সব মালামাল লুট করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, চার কক্ষের একটি একতলা ভবনের তিনটি পৃথক কক্ষে নিথর দেহগুলো পড়ে আছে। ঘরের বাইরে বিলাপ করছেন স্বজনেরা। নিহত ব্যক্তিদের একনজর দেখার জন্য বসতবাড়ির আঙিনায় শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করেন। আহাজারি করতে থাকেন নিহত সুখিয়া বেগমের বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার, ছোট মেয়ে স্থানীয় নয়াকান্দি মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী জিনিয়া আক্তার, সুমাইয়ার চাচি লিপি আক্তার ও ফুফু সাবিয়া আক্তার।

নিহত জহিরুল ইসলামের চাচাতো ভাই আবদুস সামাদ বলেন, 'আমার দুই চাচাতো ভাই জহিরুল ইসলাম ও আবদুস সাত্তার প্রায় ২৫ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকেন। কী কারণে এমন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো অনুমান করা যায়নি। অনেকের ধারণা, চোর বা ডাকাতরা যখন মালামাল লুট করেছে, হয়তো তাদের চিনে ফেলার কারণে এমন নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।'

জহিরুল ইসলামের আরেক চাচাতো ভাই জাকির হোসেন বলেন, জহিরুল ইসলামের তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার হোমনার কালমিনা জয়নগরে শ্বশুরবাড়িতে এবং ছোট মেয়ে জিনিয়া আক্তার মাদ্রাসার আবাসিক ভবনে ছিল।

নিহত জুবাইদের মা লিপি আক্তার বলেন, 'আমার তিন ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে জুবাইদ তার জেঠির ঘরে রাতে ঘুমানোর জন্য বায়না ধরে। সকালে গ্রামে মেজবানির দাওয়াত ছিল। সেখানে চার হাজার লোকের খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও করা হয়েছিল। ভাবি সুখিয়া বেগম ঘুম থেকে উঠতে দেরি করায় আমার আট বছরের মেজ ছেলে জুনাইদকে তাদের ডাকার জন্য পাঠাই। কিন্তু জুনাইদ সেখানে গিয়ে সাড়াশব্দ না পেয়ে ফিরে আসে। পরে আমি গিয়ে দেখি, একেক রুমে একেক লাশ পড়ে আছে। আমার বুকের মানিকের গলাকাটা।'

সুখিয়া বেগমের ছোট মেয়ে জিনিয়া আক্তার বিলাপ করতে করতে বলে, 'মা আমগোরে কী কইরা গেলা, কারে মা বলে ডাকমু। আল্লাহ আমাদের কী হইয়া গেল। আমার মা-ভাইরে কারা খুন করল।'

স্থানীয় ঘারমোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আলীম বলেন, 'এমন হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়ার মতো নয়। নিহত ওই নারী খুবই ভদ্র মানুষ ছিলেন। এলাকার সবাই তাঁদের পরিবারকে ভালো জানেন। কীভাবে এ ঘটনা, আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা চাই, দ্রুত পুলিশ তদন্ত করে খুনিদের গ্রেপ্তার করুক।'

সরেজমিনে দেখা যায়, সুখিয়া বেগম যে ভবনে বসবাস করেন, সেটি গ্রামের খুবই নির্জন একটি স্থানে। ভবনের দক্ষিণে প্রথমে বিশাল ডোবা, পরে কবরস্থান এবং পরে পুকুর ও বসতবাড়ি। আর পশ্চিমে সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা। পূর্ব-দক্ষিণে কিছুটা দূরে বসতবাড়ি আছে। আর বসতভবনের পশ্চিম পাশে গ্রামীণ সড়ক। এমন নির্জন স্থানে চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও সহজে কেউ শোনার কথা নয়।

খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত ব্যুরো, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, হোমনা থানার পুলিশসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, 'এই তিন খুন একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। নিহত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মর্গ থেকে নিহত ব্যক্তিদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং খুনিদের দ্রুত খুঁজে বের করার আইনি প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের একাধিক দল এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে মাঠে কাজ করছে। আমরা হত্যার নেপথ্য কারণ এবং খুনে জড়িত যে বা যারাই আছে, তাদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছি।'

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন