দ্বারে এল ঋতুরাজ বসন্ত
![]() |
| আগুন রাঙা পলাশের দেখা মেলে এই বসন্তে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
প্রকৃতিতে নবপ্রাণের স্পন্দন। বসন্তের রঙিন ছোঁয়ায় চারদিক যেন জেগে উঠেছে। কচি পাতার সবুজে, আগুনরাঙা শিমুল-পলাশের শোভায় প্রকৃতি নতুন করে জীবনগান গাইছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর ভাষায়, ‘আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,/ আজি ভুলিয়ো আপন–পর ভুলিয়ো,/ এই সংগীতমুখরিত গগনে/ তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।’
পয়লা ফাল্গুন, বাঙালির প্রাণের ঋতু বসন্তের প্রথম দিন। মাঘের শেষ বিকেলেও যে হিমেল পরশ টিকে ছিল, ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তা যেন মিলিয়ে গেছে। মহানগরের ইট-পাথরের ধূসরতা ছাপিয়ে রাজপথ দখলে নিয়েছে বাসন্তী রং। বইছে দক্ষিণা বাতাসের মৃদু হাওয়া। অনেক তরুণীর পরনে হলুদ, বাসন্তী আর কমলা রঙের শাড়ি; মাথায় গাঁদা ফুলের মুকুট। অন্যদিকে ছেলেদের পরনে রঙিন পাঞ্জাবি অথবা ফতুয়া। এই পোশাকের বৈচিত্র্য যেন ঢাকার যান্ত্রিক চেহারাকে এক মুহূর্তেই বদলে দেয়।
পয়লা বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস একই দিনে হওয়ায় উৎসবে যোগ হয়েছে বাড়তি মাত্রা। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় চিরাচরিত বসন্ত উৎসবের স্থান পরিবর্তন হয়েছে। এই উৎসব হবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর–এর ভেতরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সকাল সাড়ে সাতটায়, সীমিত পরিসরে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনই জানিয়েছে বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ।
অন্যান্যবার এই দিনে অমর একুশে বইমেলা থাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি এলাকা তরুণ–তরুণীদের পদচারণে মুখর থাকত। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তবু বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের উচ্ছ্বাসে কোনো ভাটা পড়েনি।
বসন্ত মানেই জড়তা ঝেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। রুক্ষ মাটির বুক চিরে যেমন নতুন ঘাস মাথা তোলে, তেমনি মানুষের মন থেকেও ক্লান্তি ও বিষাদ দূর করতে আসে ফাল্গুন।
বসন্তে বাংলাদেশের গ্রামবাংলার চিত্র আরও সতেজ হয়ে ওঠে। মাঠের পর মাঠ হলুদ সর্ষে ফুলের সমারোহ এখন কিছুটা কমলেও আমবাগানে মুকুলের ঘ্রাণ জানান দেয় ঋতু পরিবর্তনের বার্তা। যে শিমুলগাছটি সারা বছর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটিই এখন লালে লাল হয়ে দূর থেকেই পথচারীর দৃষ্টি কাড়ে। গ্রামে পুকুরপাড়ে ঝরে পড়া শজনে ফুল কিংবা মেঠো পথে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ মনে করিয়ে দেয়—বসন্ত শুধু রঙের নয়, নতুনের আগমনেরও ঋতু।
ফাল্গুনকে বলা হয় ফুলের মাস। এ সময় বনে-বাগানে, পথের ধারে কিংবা গ্রামের উঠোনে ফুটে ওঠে নানা রঙের ফুল। পলাশের আগুনরাঙা ছটা, রক্তকাঞ্চনের গাঢ় লাল আভা, শিমুলের নরম পাপড়ি, অশোকের সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন রঙের উৎসবে মেতে ওঠে। রাজধানীর ‘ফুসফুস’খ্যাত রমনা পার্ক–এ গেলে দেখা মেলে রক্তকাঞ্চন, গামারি ও উদালের সমারোহ। আমবাগানে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে বেড়ায় বাতাসে, কোকিলের ডাক ভরে তোলে চারদিক। এই মাসে বাতাসে মিশে থাকে এক মৃদু উষ্ণতা, যা শীতের মলিনতা ধীরে ধীরে দূর করে।
বসন্তের দ্বিতীয় অংশ চৈত্রে এসে প্রকৃতি রূপ বদলায়। ফুলের উচ্ছ্বাস কমে আসে, গরম বাড়তে থাকে। দুপুরের রোদ তীব্র হয়। চৈত্র মানেই রোদের কড়া তাপ। এ সময় বাতাসে ধুলো মেশে। গাছের পাতা ঘন সবুজ হয়ে ওঠে, কিন্তু তাতে আর ফাল্গুনের কোমলতা থাকে না। মাঠঘাট ফেটে চৌচির হওয়া, পুকুরের পানি শুকিয়ে আসা আর প্রকৃতির রুক্ষতা—সবই জানান দেয় যে গ্রীষ্মের দাবদাহ দোরগোড়ায়।
তবে চৈত্রের এই খরতাপেরও একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। ঝরাপাতার মচমচ শব্দ আর বিকেলের হলদেটে রোদে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে চৈত্রসংক্রান্তি একটি বড় আয়োজন। বছরের শেষ দিনটিকে ঘিরে যে মেলা ও উৎসব হয়, তা মূলত জরা ও ক্লান্তি দূর করে নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতি।
একদিকে ফাল্গুনের অফুরন্ত দান, অন্যদিকে চৈত্রের সব কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আমাদের জীবন আবর্তিত হয়। বসন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন যেমন রঙিন হতে পারে, তেমনি কঠোর ও শুষ্ক হওয়াটাও প্রকৃতির নিয়ম।
এই সময়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন ঋতুচক্রই বিপর্যস্ত, তখন বসন্তের চিরচেনা রূপ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। বন উজাড় আর ক্রমবর্ধমান দালানকোঠার ভিড়ে শিমুল-পলাশ ক্রমেই কোণঠাসা। তবু ঋতুরাজ প্রতিবছর ফিরে আসে তার নিজস্ব মহিমায় আমাদের মনে করিয়ে দিতে যে শীতের রিক্ততার পর নবজাগরণ অনিবার্য। প্রকৃতির এই চক্রই আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

Comments
Comments