[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের সুপারিশ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ফাইল ছবি

মাধ্যমিকে সব বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিয়ে মূল দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সুপারিশ করেছে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত কমিটি। অন্তর্বর্তী সরকারের এই কমিটি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞান বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি ইত্যাদি) বাতিল করার সিদ্ধান্ত বজায় রাখা এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে একই ধরনের পাঠ্যবই বা শিক্ষা পরিকল্পনার আলোকে পড়িয়ে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এভাবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।

মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত এই কমিটি সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানানো হয়েছে। গত অক্টোবরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়ানো, ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত উন্নয়ন এবং শেখানোর পদ্ধতির উৎকর্ষ সাধনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই কমিটি করা হয়।

কমিটি দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৪৪টি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে। এছাড়া অষ্টম ও নবম শ্রেণি শেষ করা ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষাও নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সুপারিশ করেছে কমিটি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কমিটির প্রতিবেদনে শেখানো ও শেখার প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বর্তমান পাঠ্যবিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে কমিটি। তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরির উপায় হিসেবে শ্রেণিকক্ষে এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কাজে কম্পিউটার ব্যবহার ও চর্চার সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দশম শ্রেণি পর্যন্ত একই ধরনের শিক্ষা পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিটি বলেছে, নবম শ্রেণি থেকে পড়াশোনাকে বিভিন্ন শাখায় (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা) ভাগ করার সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। এই বিভাজন একাদশ শ্রেণি থেকে হওয়া উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে শাখা বিভাজন তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সরকার সেই সিদ্ধান্ত বদলে আবারও মাধ্যমিকে বিভাগ বা শাখা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের অনেক বিষয়ও ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে এখন পর্যন্ত নবম শ্রেণিতে শাখা নির্বাচন করতে হচ্ছে, যে বিষয়ে এই কমিটি ভিন্নমত দিল।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় সহশিক্ষাক্রমিক বা পাঠ্যবইয়ের বাইরের কার্যক্রমকে বছরজুড়ে নিয়মিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

কমিটি বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানত জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মের ছুটি হতে পারে।

কমিটি জানিয়েছে, পাবলিক পরীক্ষা শুধুমাত্র মৌলিক দক্ষতার বিষয়গুলোতে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞান) নেওয়া হবে। এসব বিষয়ের প্রশ্ন হবে দক্ষতা ও মেধার প্রয়োগ যাচাইয়ের জন্য। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কম্পিউটার শেখার ক্ষেত্রে পরীক্ষার চেয়ে হাতে-কলমে চর্চা ও অভিজ্ঞতার ওপর বেশি জোর দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ে বার্ষিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাঠ্যবই ও নির্ধারিত বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর পাবলিক পরীক্ষা হবে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য। বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বার্ষিক প্রতিবেদন (রিপোর্ট কার্ড) দেওয়া যেতে পারে, যেখানে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়টিও থাকবে। পাবলিক পরীক্ষার ফলের জন্য আলাদাভাবে বিষয়ভিত্তিক গ্রেড দেওয়া যাবে।

অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা আগেই বাতিল করা হয়েছে। তবে গত বছর শিক্ষাবিদদের আপত্তি সত্ত্বেও হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষা চালু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির পাশাপাশি বৈষম্য বাড়ায় এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কমিটি বলেছে, অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা উচিত এবং বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কমিটি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত নতুন শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রধানত জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মকালীন ছুটি হতে পারে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ পালন করা হয়।

পুরো বিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সবার জন্য উন্মুক্ত বা সর্বজনীন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রস্তাবটি দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আলাদা 'শিক্ষা অধিকার আইন' তৈরির মাধ্যমে একে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

দীর্ঘ মেয়াদে জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের হাতে মাধ্যমিক শিক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও মাধ্যমিক শিক্ষা টাস্কফোর্স গঠন এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদপ্তর তৈরির সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্য পরীক্ষামূলক প্রকল্প (পাইলট প্রজেক্ট) গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। তারা বলেছে, মধ্যমেয়াদে অন্তত ১০টি জেলায় এই কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ মেয়াদে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ ছাড়া বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের (সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি) না রেখে প্রকৃত অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশসহ আরও অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।

কমিটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোই শিক্ষা সংস্কারের শেষ কথা নয়। আসল বিষয় হলো, শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়ন দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত থেকেছে। এখন এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা করতে হবে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন