আইনের শাসন ও বিনা বিচারে আটকের বাস্তবতা
![]() |
| বিচার | প্রতীকী ছবি |
বৈষম্য বিলোপ আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিই ছিল ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য, যা পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনমনে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে আইনের শাসনের ব্যত্যয় ও বিনা বিচারে আটকে রাখার নজির দেখা যায়। বিশেষ করে ৫ই আগস্টের পর দায়ের হওয়া অনেক মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগ ওঠে। তবে নতুন নির্বাচিত সরকার এখন সেই ক্ষত নিরাময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনের শাসনের বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা হবে ‘আইনের শাসন’। কোনো দলীয় প্রভাব বা জোর-জবরদস্তি নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ হয়রানিমূলক মামলাগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে বিরোধী নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আরও ১২০২টি মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে প্রথম দফায় ১০০৬টি এমন মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল জানিয়েছেন, ৫ই আগস্টের পর দায়ের হওয়া কিছু মামলায় ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিলের জন্য সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে জড়ানো হয়েছে। একটি সুবিধাবাদী শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে এসব করেছে যা সরকারের নজরে এসেছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করা হবে এবং সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। কেউ যেন অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
বিচার বিভাগে কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিচার বিভাগকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করার বিষয়ে এই কড়া বার্তা দেন।
এদিকে হয়রানিমূলক মামলায় জামিন না পাওয়া প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে বিচার বিভাগ এতদিন জামিন দিতে ইতস্তত বোধ করছিল। তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভুক্তভোগীরা আইনি প্রতিকার পাবেন বলে আশা করা যায়।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, কাউকে হত্যা মামলার আসামি করা হলে জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাই এ ধরনের হয়রানি রোধে দ্রুত তদন্ত শেষ করা জরুরি।
গত দেড় বছর ধরে কারাগারে আছেন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত। তাঁর পরিবারের দাবি, তিনি নানা জটিল রোগে ভুগলেও সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ভাটারা এলাকায় একটি হত্যা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। উচ্চ আদালত তাঁর জামিনের বিষয়ে রুল জারি করলেও ৯ মাসেও তার নিষ্পত্তি হয়নি। শ্যামল দত্তের স্ত্রী সঞ্চিতা দত্ত বলেন, ‘আমরা আইনি লড়াই করতে চাই, কিন্তু অন্তত জামিন পাওয়ার অধিকারটুকু দেওয়া হোক।’
ক্যানসার আক্রান্ত সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন। প্রথমে একটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে আরও চারটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। একাধিকবার জামিন আবেদন করেও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা পাননি।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে ৫ জন কারাগারে রয়েছেন। সাংবাদিক ছাড়াও লেখক ও আইনজীবীদের পরিবারের পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ উঠেছে যে, তাঁরা যথাযথ আইনি অধিকার পাচ্ছেন না।
মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে মামলা হতেই পারে, কিন্তু জামিন পাওয়া তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। ইচ্ছাকৃতভাবে জামিন রুদ্ধ করা আইনের লঙ্ঘন। বিচার কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নয়, বরং আইন ও সংবিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত।’

Comments
Comments