[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রূপগঞ্জে রপ্তানিমুখী কারখানায় হামলা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
লুটপাটের শিকার কারখানা। রোববার দুপুরে রূপগঞ্জের দাউদপুর এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রাম। এই গ্রামেই রয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধী মনোয়ার হোসেন ওরফে অপুর (৪৩) জিআই তার তৈরির একটি কারখানা। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, এখান থেকে উৎপাদিত জিআই তার সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিসহ বিশ্বের ১২টি দেশে রপ্তানি করা হয়।

কারখানাটির নাম ‘বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ’। গত রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার বাইরে ভাঙচুরের চিহ্ন। সামনে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটিতে কর্মীদের মারধর ও ভাঙচুর চালানো হয়। এমনকি ট্রাক নিয়ে এসে মালামাল লুট করা হয়েছে। এই হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। বর্তমানে শিল্প পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে কাজ চলছে।

এই ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় একদল লোক কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেনের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এর পাশাপাশি প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে দেওয়ারও দাবি জানান তাঁরা। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

মনোয়ার হোসেন গত শুক্রবার বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে লুটপাট শুরু হয় কারখানাটিতে, যা চলে দেড় ঘণ্টা ধরে। রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানাটিতে যেতে ১৫-২০ মিনিট লাগে। কিন্তু তিনি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে হামলাকারীরা চলে যায়।

নোয়াগাঁও ও এর পাশের দাউদপুর এলাকাটি বেশ জনবহুল। এখানে হালকা প্রকৌশল, রাসায়নিক ও পোশাকশিল্পের বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। গড়ে উঠেছে মাঝারি ও ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী কিছু প্রতিষ্ঠানও। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘বিএলও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ’। ২০২০ সালে সাড়ে ১০ শতাংশ জমি কিনে এই কারখানা তৈরি করেন মনোয়ার হোসেন। কারখানাটিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে।

মনোয়ার হোসেন জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে কারখানাটিতে লুটপাট শুরু হয় এবং তা চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে। রূপগঞ্জ থানা থেকে কারখানায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট। কিন্তু জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার দুই ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। ততক্ষণে হামলাকারীরা সেখান থেকে চলে যায়।

কারখানার তিনজন শ্রমিক ও স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামলাকারীরা শাবল দিয়ে কারখানার প্রধান ফটক ও সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢোকে। সে সময় কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ খান বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধর করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে কর্মচারী জুলহাস উদ্দিনকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে তাঁদের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীরা কারখানার নজরদারি ক্যামেরা (সিসিটিভি) ভেঙে ফেলেছে এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে। এ ছাড়া তারা ট্রাক নিয়ে এসে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল লুট করে নিয়ে গেছে।

মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা নগদ অর্থসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে গেছে।

কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার দিন তিনি মামলা করতে গিয়েছিলেন। তখন রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ না দিলে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাধ্য হয়ে মাহফুজুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে মামলা করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন, ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন এবং মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপির কর্মী মো. সজল হোসেন, সাদিকুল, মো. ফাহিম, আজিজ মৌলভি ও বোরহানউদ্দিন। আসামিদের বেশির ভাগই জিন্দা গ্রামের বাসিন্দা।

মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলাকারীরা নগদ টাকাসহ ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। মনোয়ার হোসেনের দাবি, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকন ও নিশাত আকন সভাপতির নাম ব্যবহার করে বারবার চাঁদা দাবি করেছেন। বিষয়টি তিনি অন্তত চারবার মাহফুজুর রহমানকে জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো চাঁদা দাবি করা ব্যক্তিদের সঙ্গে আপস করার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন।

মনোয়ার হোসেন আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় মাহফুজুর রহমান উপস্থিত না থাকলেও তাঁর নির্দেশেই কারখানায় হামলা ও লুটপাট হয়েছে। মামলা করার সময় তিনি মাহফুজুর রহমানকে হুকুমের আসামি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু থানার ওসি তাঁর নাম বাদ না দিলে মামলা নেবেন না বলে জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি বাধ্য হয়ে নাম বাদ দিয়েই মামলা করেন।

অবশ্য রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন দাবি করেছেন, তিনি কারও নাম বাদ দিতে বলেননি। তিনি শুধু মামলায় সত্য ঘটনা উল্লেখ করতে বলেছেন।

কারখানা মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে কোনো দিন দেখিনি। ফলে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে চার দফায় জানানোর দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। জানালে আমি ব্যবস্থা নিতাম।

মাহফুজুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি

উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, ‘কারখানা মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে কোনো দিন দেখিনি। ফলে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে চারবার জানানোর দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। আমাকে জানালে আমি ব্যবস্থা নিতাম। ঘটনার দিন থানা থেকে ফোন পেয়ে আমি বরং খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনজনকে পাঠাই। পরে শুনি এই তিনজনের নামেই মামলা হয়েছে।’

মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, তিনি শুনেছেন কারখানাটিতে পরিবেশ দূষণকারী ব্যাটারি তৈরি করা হয় এবং এ কারণে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ।

এই বক্তব্যের বিষয়ে কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেন বলেন, মাহফুজুর রহমানকে তিনি সরাসরি জানাননি, জানিয়েছেন লোক পাঠিয়ে। আর রপ্তানিমুখী জিআই তার ছাড়া তিনি অন্য কিছুই তৈরি করেন না। ব্যাটারি তৈরির কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা।

মনোয়ার হোসেন আরও দাবি করেন, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য মঙ্গলবার বিকেলে মাহফুজুর রহমানের পরিচয় দিয়ে তাঁকে দুই দফা হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি। তাঁরা চেষ্টা করছেন এবং অন্য সংস্থায় মামলাটি দেওয়ার কথা চিন্তা করছেন।

মো. সবজেল হোসেন, রূপগঞ্জ থানার ওসি

জানা গেছে, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেনকে নির্দেশ দেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। এরপর স্থানীয় জিন্দাপার্কের ভেতর থেকে প্রধান আসামি বেলায়েত আকনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ধরার কিছুক্ষণ পরই পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়।

মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে বেলায়েত আকনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী মুঠোফোনে জানান, বিষয়টি তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন। এই মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, তা জানতে তিনি রূপগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. সবজেল হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি। পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং অন্য কোনো সংস্থায় মামলাটি হস্তান্তরের কথা ভাবছে। আসামি ধরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে অনেক মানুষ ছিল। প্রধান আসামিকে ধরে ছেড়ে দেওয়ার দাবি সঠিক নয়। তবে কৌশলে আসামির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

 
যেহেতু এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আমরা চাইব বিষয়টি আইনগতভাবে দেখা হোক। দল থেকেও আমরা এ ঘটনার তদন্ত করব এবং তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি

কারখানা লুটের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তাঁদের নিয়মিত কম-বেশি চাঁদা দিতে হয়। তবে এভাবে হামলা ও মালামাল লুটের ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মামুন মাহমুদ মুঠোফোনে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের ঘটনার কথা এসেছে, তা সত্য হলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তারা যত বড় নেতাই হোক না কেন, দল তাদের অপরাধী হিসেবেই দেখবে। দলীয় পরিচয়ে কেউ কোনো ছাড় পাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আমরা চাইব বিষয়টি আইনগতভাবে দেখা হোক। দল থেকেও আমরা এই ঘটনার তদন্ত করব এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন