[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

সংকটে অর্থনীতি, নতুন সরকারের সামনে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
টিসিবির পণ্য নিতে ক্রেতাদের ভিড়  | ফাইল ছবি

আর এক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে নতুন একটি সরকার। বদলে যাওয়া বাংলাদেশে জনমণের বিপুল প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হবে তাদের। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরানো।

ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শেষ পর্যায়ে। দেশ যখন আবারও গণতন্ত্রে ফেরার চূড়ান্ত ধাপে, তখন পরবর্তী সরকার অর্থনীতির এই কঠিন পথ কীভাবে পাড়ি দেবে, সেই আলোচনা এখন সবখানে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের কথা বললেও সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর বড় দায়িত্ব থাকবে নতুন সরকারের ওপর। তেমনি দুর্নীতি আর ভুল নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে সচল করতে প্রয়োজন হবে সঠিক পদক্ষেপ ও সংস্কার।

এমন পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর গুছিয়ে ওঠার আগেই বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে নির্বাচিত সরকার।

দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা জিনিসের দাম কমানো, ব্যাংক খাতের অনিয়ম দূর করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার মতো বহুমুখী চাপ সামলাতে হবে আগামী প্রশাসনকে।

মহামারীর ধাক্কা ও চব্বিশের অভ্যুত্থানে দেশের অর্থনীতি যে গভীর সংকটে পড়েছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড় করানোর বদলে অন্তর্বর্তী সরকার বেশি মনোযোগ দিয়েছে নতুন করে পতন ঠেকাতে। রাষ্ট্র সংস্কারের বড় আলোচনার মধ্যেও অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বরং বর্তমান সরকার উত্তরসূরিদের জন্য যে অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, তাতে বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো নতুন সংকট যোগ হয়েছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রশাসনকে দায়িত্ব নিয়েই চাঁদাবাজির লাগাম টানতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে জোর দিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে কার্যকর বাণিজ্য নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি দুর্বল রাজস্ব কাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কীভাবে সমঝোতা করে ব্যবসা বাড়ানো যায়, সেই পথও খুঁজে বের করতে হবে।

পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও গৎবাঁধা রাজনৈতিক ধারা আমূল পরিবর্তন না হলে পুরো দেশই বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও উঠে আসছে।

নির্বাচনের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এসব চ্যালেঞ্জ সামলে নতুন যাত্রা শুরু করতে পারবে—এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদ বলেন, এর উত্তর নির্ভর করবে নবনির্বাচিত সরকার কতটা দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে কাজ চলছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে শক্ত অবস্থান নিয়ে নতুন ধারার সূচনা করতে হবে। এ জন্য কিছু স্পষ্ট উদ্যোগ বাস্তবে দেখা জরুরি।’

বিশ্লেষকদের সতর্কতা, নতুন সরকার যদি প্রথম দিন থেকেই জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নানা নামে ঋণ নিয়ে তার বড় অংশ বিদেশে পাচার করার কারণে ব্যাংকিং খাতে অর্থের সংকট এখনও তীব্র।

সে সময় অর্থনীতির ক্ষত নানা কৌশলে আড়াল করে রাখায় প্রকৃত চিত্র অনেকটাই অজানা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে সেই তথ্যের কিছু অংশ প্রকাশ করলেও, তাদের রেখে যাওয়া ব্যর্থতার পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে।

বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যের প্রবাহে বাধা, তথ্য গোপন রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য বদলে নেওয়ার এই চর্চা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তবে নির্বাচনের পর আগামী সংসদে বিরোধী দল শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সুস্থ ধারায় ফেরার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।

তবে নতুন ও প্রয়োজনীয় নীতিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে এটিই যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, সেই আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন মিনহাজ মান্নান। তিনি বলেন, ‘যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তার বিপক্ষে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে। ফলে পরবর্তী সরকারের জন্য দেশ পরিচালনা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’

দেড় বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকার যে অবস্থায় অর্থনীতি পেয়েছিল, বিদায়ের সময় এসে রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতে আপাত স্থিতিশীলতা ছাড়া সংখ্যার বিচারে তেমন কোনো ইতিবাচক চিহ্ন রেখে যেতে পারেনি।

বিগত সরকারের শেষ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ধরে রাখা এবং অর্থ পাচারের কারণে ডলারের রিজার্ভ কমতে কমতে একেবারে নিচের স্তরে নেমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রেমিটেন্সের প্রবাহ বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়।

এর ফলে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করা রিজার্ভ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বেড়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পাশাপাশি মোট বা ‘গ্রস’ রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়ে যায়।

বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স বাড়লেও চাপ পড়ে আমদানির ওপর। ডলারের দাম প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় আমদানির প্রবণতা কমে যায়। আবার রপ্তানিতে যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছিল, সেটিও খুব বেশি দিন টেকেনি।

টানা ছয় মাস ধরে পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে দেশের আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছিল ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

আমদানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বরে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কম।

এই প্রবণতা আগের মাসগুলোতেও ছিল। নভেম্বর ও অক্টোবরে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি ১০ শতাংশের বেশি কমে। নভেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এটি কম ছিল ১০ শতাংশ, আর অক্টোবরে কমে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

তবে রেমিটেন্সের প্রবাহ এখনও কিছুটা আশা জাগিয়ে রাখছে। অর্থনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতিতে সাময়িক স্বস্তির আভাস মিললেও, সেটি আবার ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে।

কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও, টানা কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা এক পর্যায়ে এসে থেমে গেছে।

ধাপে ধাপে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি টানা দুই মাস ধরে আবার বাড়ছে। ডিসেম্বরে এসে এটি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নেমে এসেছে একেবারে নিচের স্তরে। উচ্চ সুদের হার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আস্থা রাখতে পারছেন না। এর ফলে বেকারত্বের হারও পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি বোঝার অন্যতম সূচক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হারেও আশাব্যঞ্জক চিত্র নেই।

২০২৪–২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। এত কম বাস্তবায়নের হার আগে কখনো দেখা যায়নি।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রথম ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র সাড়ে ১৭ শতাংশ, যা আগের চার অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম।

বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও স্বস্তির কিছু নেই। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিদেশি ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদান বাড়াবে—এমন প্রচারণা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে তার বিপরীত।

ডিসেম্বর শেষে দেখা যায়, আগের ছয় মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে যে অর্থ ছাড় হয়েছে, তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম।

এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১৯৯ কোটি ডলারের ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ১৩ শতাংশ কম। 

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান বলেন, ‘সত্যি বলতে গেলে, গত ১৫ বছরে আগের সরকার অর্থনীতিকে যে অবস্থায় রেখে গেছে, তাতে প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে। তারা ব্যাংক খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পেরেছেন, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে কোনো ভালো খবর দিতে পারেননি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মোট ঋণ, টাকার মূল্যমান কিংবা মূল্যস্ফীতি—কোনো ক্ষেত্রেই তারা ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন দেখাতে পারেননি। ব্যবসা খাতেও কোনো ধরনের আগ্রহ বা উদ্দীপনা তৈরি হয়নি।’

মিনহাজ মান্নানের ভাষ্য, ‘ব্যবসায়ীরা কার্যত হাত গুটিয়ে বসে আছেন। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রায় বন্ধ। সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন চরম স্থবির অবস্থায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তার জন্য দেশ পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন হবে।’

অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় দশকে কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির চমক দেখা গেলেও বাস্তবে অর্থনীতিতে তেমন কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। বিশেষ করে করনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশের কর ও জিডিপির অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামো নিয়ে একটি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা কঠিন।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার বলেন, ‘নতুন সরকার যদি এখন অর্থনীতির গতিপথ বদলাতে চায়, তাহলে বেশ কিছু গভীর সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের করের আওতা কম—এটা ঠিক। কিন্তু আমরা যে খুব কম কর দিই, তা নয়। বরং করের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেদিকেই তাকান, করের হারই বেশি। মূলত আমাদের করব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার দরকার। নতুন সরকারকে সবার আগে এই খাতেই বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই করব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়ছে, তেমনি করদাতারাও কষ্ট পাচ্ছেন। পাশাপাশি কর আদায়কারীদের দক্ষতা ও কর নীতি নিয়েও আমাদের মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তাই এখানে নতুন পদ্ধতি চালু করা জরুরি।’

কর কাঠামোর কারণে বিনিয়োগে গতি আসছে না—এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই পরামর্শক বলেন, ‘এই করব্যবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ আসতে চায় না। আর যারা এসেছে, তারাও নানা অভিযোগ করছে। হঠাৎ কর কর্মকর্তারা এসে বলেন, এত কোটি টাকা আপনার ওপর পড়ে গেছে—যার অনেকটাই ভিত্তিহীন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর নানা অজুহাতে ঘুষ চাওয়ার ঘটনাও ঘটে—বলছে টাকা দিলে সব ঠিক করে দেবে। এ ধরনের অনেক বিষয় সামনে আসছে। তাই আমি বলছি, করব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার করতেই হবে।’

জায়েদী সাত্তারের মতে, বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশও এখন ‘খুবই খারাপ’। বিদ্যমান বাণিজ্য নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাণিজ্য নীতিতে যথেষ্ট উদারীকরণ দরকার। শুল্ক কাঠামোয় যৌক্তিকতা আনতে হবে। সেটা না হওয়ায় আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে—আমরা তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে পারছি না।’

এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরানোর পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ।

তিনি বলেন, নতুন সরকারকে একসঙ্গে অনেক কাজে হাত দিতে হবে। এর মধ্যে প্রথম কাজ হবে অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য আস্থা সবচেয়ে জরুরি। সেখানে দ্রুত ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু অর্থনৈতিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো প্রথম ধাপেই যদি শক্ত হাতে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে পরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।’

এই অর্থনীতিবিদের মতে, দায়িত্ব নিয়েই নতুন সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি ‘শক্ত বার্তা’ দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এটা অর্থনীতির জন্য জরুরি, রাজনীতির জন্য জরুরি, আবার স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি। আমরা সেই দৃঢ় বার্তাটাই দেখতে চাই। তারা কতটা সফল হবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এরপর কোন খাতকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নানা মত থাকতে পারে।’

কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, ব্যবসা খাতের পাশাপাশি কৃষি খাতকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, তাঁর মতে, দুই খাতই এখন ‘সংকটপূর্ণ অবস্থায়’ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনের যে কর্মসূচিগুলো ছিল, সেগুলো আবার চালু করে আরও শক্তিশালী করা।’

একই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান, যিনি সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘প্রথমেই যে সরকার দেশ পরিচালনা করবে, তাকে জনগণের কাছে স্পষ্ট করতে হবে যে তারা সৎ ও আন্তরিক। তাহলে মানুষ বিশ্বাস করবে, সময় দেবে, সুযোগ দেবে এবং সরকারের সঙ্গে হাত মিলাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু যদি প্রথম দিন থেকেই এ ধরনের কোনো আশ্বাস বা বিশ্বাস তৈরি না হয়, তাহলে অর্থনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। শুধু সুশাসনের কথা বললেই হবে না, সেই বার্তাটি কাজে ও আচরণে জনগণকে বিশ্বাস করাতে হবে।’

মিনহাজ মান্নানের কথার মূল কথা, নতুন সরকারের কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আপনি মুখে বলবেন দুর্নীতি চান না, কিন্তু বক্তব্যের সময় ঋণখেলাপিকে পাশে রাখবেন—জনগণ তা মেনে নেবে না। বলবেন সন্ত্রাস দমন করবেন, অথচ পাশে সন্ত্রাসী দাঁড়িয়ে থাকবে—মানুষ বিশ্বাস করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনি বলবেন শেয়ারবাজার ভালো করবেন, অথচ যারা শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, তাদেরই মন্ত্রিসভা বা দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখবেন—তাহলে মানুষ আস্থা পাবে না। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই সমাধান করতে হবে।’

মিনহাজ মান্নানের মতে, অর্থনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ক্ষমতার সমীকরণে বাংলাদেশের অবস্থান বুঝে নেওয়ার সক্ষমতাও নতুন সরকারের থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা যদি অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরাতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশই বড় বিপদে পড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাশের দেশ পাকিস্তান ও চীনের মতো শক্তিধর দেশের মধ্যকার জটিল বৈশ্বিক রাজনীতির ভেতরে বাংলাদেশ এখন পড়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব আগের মতো বাংলাদেশকে এখন আর দেখে না। বাংলাদেশকেও তারা তাদের বৈশ্বিক রাজনীতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে যারা পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসবে, তারা যদি বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, সেটাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

কে এ এস মুর্শিদ বলেন, ‘আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা খুব কঠিন নয়। সাধারণ বুদ্ধি দিয়েই মোটামুটি বোঝা যায়, কারণ সমস্যাগুলো খুবই মৌলিক ও প্রাথমিক। তবে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের “যেমন চলছে তেমনই চলুক” মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

অর্থনীতিবিদ জায়েদী সাত্তারের পরামর্শ, কর কমিয়ে বাণিজ্যে গতি ফেরাতে হবে। একই সঙ্গে শুরুতেই মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পায়।

তিনি বলেন, ‘একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বাধীনতা দিতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয় আরও ভালো করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এ জন্য নতুনভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চ পর্যায়ের একটি অর্থনৈতিক নীতি পরিষদ গঠন করাও জরুরি বলে আমি মনে করি।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন