[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রাজশাহীতে যুবককে গুলি করে হত্যা, আগে থেকেই পাচ্ছিলেন ‘শায়েস্তার’ হুমকি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
রাজশাহীতে মসজিদে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ মোস্তফার বাড়িতে মাতম চলছে। তাঁর স্ত্রী বিলাপ করছেন। রোববার সকালে নগরের ডাঁশমারী এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

'ওরা বলেছিল আগে আমরা মাইরবো, তারপর মীমাংসা হবি। ভোটের আগে বলেছিল একটা লাশ ফেলে তারপর বিচার করব। নির্বাচন হওয়ার পর শায়েস্তা করা হবে।' ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন গতকাল শনিবার রাতে রাজশাহীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মো. মোস্তফার (৫০) ভাইয়ের মেয়ে শাকিলা খাতুন।

গতকাল রাত আটটার দিকে এশার নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে নগরের খোঁজাপুর গোরস্তানের পাশের রাস্তায় মোস্তফা গুলিবিদ্ধ হন। পরিবারের দাবি, আগের একটি বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এশার নামাজ পড়তে পাশের একটি মসজিদে যাচ্ছিলেন মোস্তফা। তখনই দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে। স্থানীয় একটি ময়দা মিলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে। আড়াই মাস আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এক মেয়ে মারা গেছেন। পরিবারটি এখন শোকের ভারে ভেঙে পড়েছে।

রোববার সকালে নিহত ব্যক্তির স্ত্রী নাদেরা বেগম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। নাম উল্লেখ করা আসামিরা হলেন স্থানীয় নহির উদ্দিনের ছেলে মো. উকিল, স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হাসিবুল মোল্লা ও শিহাবুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে হাসিবুল ২৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। উকিলকে নির্বাচনের পর রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনুকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান। তিনি নির্বাচনী প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন। শিহাবও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিবার দাবি করেছে। ঘটনার পর তাঁরা পরিবারসহ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

মামলার এজাহার ও নিহত ব্যক্তির স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে নিহত মোস্তফার ভাতিজা চঞ্চলকে ঘিরে একটি ঘটনা ঘটে। চঞ্চল নেশাগ্রস্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। খোঁজাপুর মোড়ে একটি দোকানে বসে থাকার সময় চঞ্চলের মাধ্যমে দোকানের কিছু মালামাল ভেঙে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দোকানদারের পক্ষের লোকজন চঞ্চলকে মারধর করেন। অভিযোগ রয়েছে উকিল, হাসিবুলসহ কয়েকজন দোকানদারের পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সেদিন মারধরে অংশ নেন। এরপর চঞ্চলের স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উকিলকে মারধর করেন। পরে উকিল লোকজন নিয়ে চঞ্চলের বাড়ির দিকে ছুটে যান। সেদিন মোড়ে না পেয়ে তাঁরা বাড়িতে গিয়ে হামলা চালান। এ সময় উকিল গ্রুপের ছোড়া ইটে মাথায় আঘাত পান মোস্তফা। তাঁর মাথায় ১০টি সেলাই লাগে। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষই মামলা করে। মামলা আদালতে বিচারাধীন। নিহত ব্যক্তির পরিবার জানায়, একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিচার হবে না। পরিবারটির দাবি, সেই সময় থেকেই তাঁরা হুমকি পেয়ে আসছিলেন।

শাকিলা খাতুন বলেন, 'আমার চাচাতো ভাইকে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাচার মাথায় ১০টি সেলাই লেগেছিল। তখন মুরব্বিরা বসে মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওরা বলেছিল, নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিচার হবে না। ভোট শেষ হওয়ার পর এশার নামাজের সময় চাচাকে একা পেয়ে ওরা আক্রমণ করে। আগের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ওরা ছাড়া আমাদের কোনো খোলাখুলি শত্রু নেই।'

নিহত মোস্তফার স্ত্রী নাদেরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'আমার স্বামী অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। অজু করে নামাজে যাওয়ার সময় এমন হলো কেন? তিনি তো কারও ক্ষতি করতেন না। ঘরে ফিরে এসে চা খেতে চাইতেন, বাইরে আড্ডা দিতেন না।' অতীতের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'উকিল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে একবার ঝামেলা হয়েছিল। তখন উনি ও তাঁর লোকজন মেরেছিল। আমি এ ঘটনার বিচার চাই, ফাঁসি চাই।'

নিহত ব্যক্তির ভাতিজা মো. উজ্জ্বল আলী বলেন, 'এলাকায় তাদের সঙ্গে মারামারি হওয়ার পর হুমকি দিয়ে আসছিল। আর বলছিল, ভোটের পর গুলি করে মেরে ফেলবে তারা।'

রোববার সকালে মোস্তফার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা ভিড় করেছেন। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে কাঁদছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, মোস্তফা শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কেন তাঁকে টার্গেট করা হলো, এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মুখে।

স্থানীয় শিক্ষক আবদুল মতিন, যিনি নিহত ব্যক্তির দুই মেয়েকে পড়াতেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'ওনার দুই মেয়ে আমার ছাত্রী। খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। এমন মানুষকে হত্যা করা হলো, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। এই পরিবার এখন কীভাবে চলবে? আমি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি চাই।'

নগরের মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিহত ব্যক্তির স্ত্রী তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগের একটি ঘটনার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা ছিল। নতুন মামলায় নিহত ব্যক্তির পরিবার দাবি করেছে, আগের ঘটনার আসামিরাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পলাতক। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন