[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

হাতিয়ার নয়, ভাসানচর এখন সন্দ্বীপের

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ভাসানচর | ফাইল ছবি

ভাসানচর সন্দ্বীপের নাকি হাতিয়ার—এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান হয়েছে। ভাসানচরের ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর আগে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর হাতিয়ারবাসীর মধ্যে সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল।

২০১৭ সালে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দ্বীপটিকে হাতিয়ার অন্তর্গত দেখায়। ওই প্রজ্ঞাপনের পর সন্দ্বীপের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় গঠিত একটি কারিগরি কমিটি ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেয় এবং ১৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠায়।

সরেজমিন পরিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিল পর্যালোচনা এবং স্যাটেলাইট ইমেজ, অর্থাৎ ভূ-উপগ্রহ থেকে ধারণ করা ছবি বিশ্লেষণ করে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটি দ্বীপটির ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন দেয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ১৯৯২ সালের দিকে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন সাগরের নিচে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের কিছুক্ষণ পরই সেখানে পুনরায় চর জাগতে শুরু করে। সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে নতুন ভূমি জেগে ওঠা শুরু করে বলে বন বিভাগের তথ্য সূত্রে জানা গেছে। এরপর কয়েক দশক ধরে দ্বীপের ভূমির পরিমাণ বাড়তে থাকে। স্থানীয়ভাবে এই চরটি ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিত হলেও ২০১৭ সালের দিকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের আলোচনার সময় সেটির নামকরণ করা হয় ভাসানচর। একই বছর দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে এটিকে নোয়াখালীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ সেখানে ‘ভাসানচর থানা’ গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপনেও ভাসানচরকে হাতিয়া ও নোয়াখালীর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হলে সন্দ্বীপের ছাত্র, পেশাজীবী ও অন্যান্য স্তরের মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

সম্প্রতি সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সীমানা জটিলতা নিরসনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ‘চট্টগ্রাম-নোয়াখালী জেলার সীমানা জটিলতা নিরসন কমিটি’ নামে এই কমিটিতে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে পেশাজীবীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা ভাসানচরকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন জমা দেয়।

ভাসানচরের সীমানা নিয়ে বিরোধ নিরসনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। গত ৭ এপ্রিল এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ভাসানচরকে হাতিয়ার দাবি করেন। একই সময়ে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে হাতিয়া দ্বীপ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তোলা হয়। একই দিনে চট্টগ্রামেও হাতিয়াবাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে যায় ১৯৯২ সালে। এরপর ওই স্থানে নতুন ভূমি জেগে ওঠে। সন্দ্বীপ থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে এই নতুন দ্বীপ জেগে ওঠে, যেটি এখন ভাসানচর নামে পরিচিত। সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের দাবি, এটি ভাঙনে বিলীন হওয়া ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের জায়গায় গড়ে উঠেছে, তাই দ্বীপটি সন্দ্বীপেরই।

সন্দ্বীপের প্রায় সব ইউনিয়নের মানুষের আদি ভিটা ছিল ন্যায়ামস্তিতে। ফলে ভাসানচর নোয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত করার সরকারি ঘোষণার প্রতি সন্দ্বীপবাসী তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। সে সময় মনিরুল হুদা নামের এক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদালতে আবেদন করলে আদালত নির্বাহী বিভাগের প্রতি নির্দেশ দেন জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নিতে। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী বিভাগ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে।

কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসকসহ সন্দ্বীপ ও হাতিয়া উপজেলার থেকে তিনজন করে পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

গত ৯ মার্চ এই কমিটির প্রথম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিএস ও আরএস জরিপ এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ ভাসানচরকে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার ভূমি হিসেবে প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য আরও সময় নেওয়া হয়েছিল।

ডিপটি সওদাগরের বাড়ি ছিল ন্যামস্তির ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। বর্তমানে তিনি সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের কাছে থাকেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সাবেক বাড়ির জায়গাটি চিহ্নিত করতে পারেন, যা এখন ভাসানচরের মধ্যভাগে পড়ে। তাঁর দাবি, জেগে ওঠা ভূমি কোনো আলাদা মৌজার নয়, বরং ভাসানচরের আরও বাইরে পর্যন্ত সন্দ্বীপের ভূমি।

তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘১৯৯৫ সালে আমরা সারিকাইতে চলে আসি। এটা বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। কিসের ভিত্তিতে ভাসানচরকে নোয়াখালীর সঙ্গে যুক্ত করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। শেষ পর্যন্ত ভাসানচরের মালিকানা ফেরত পেয়ে আমরা ভীষণ খুশি।’

সন্দ্বীপের নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা বলেন, ‘ভাসানচর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপবাসী নাখোশ ছিলেন। এখন এমন সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দ্বীপের মানুষ আনন্দিত।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন