ভোটের লড়াই: ধর্ম ও অতীত ঘিরে টানাটানি
![]() |
| বিএনপি-জামায়াত | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
ভোটের মাঠে কথার লড়াই শুরু হয়েছে। প্রতিপক্ষকে পিছিয়ে দেওয়ার এবং ভোটারের মন জয় করার জন্য দলগুলো একে অপরকে আক্রমণ করছে। গত দুই দিনে জনসভা ও পথসভায় নেতাদের ভাষণে ধর্ম বিষয়টি বড় করে সামনে এসেছে। এছাড়া অতীত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতি নিয়েও চলছে একে অপরের প্রতি আঙুল তোলা। সবশেষে, দলগুলো জনকল্যাণমূলক নানা প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে কথার এই যুদ্ধে দলগুলো এখনও পুরোনো পথে হাঁটছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আমাদের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমরা নতুন আশা করেছিলাম। কিন্তু তা দলগুলোর আচরণে প্রতিফলিত হয়নি। যতক্ষণ এটি পরিবর্তন হবে না, আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি আশা করা যায় না।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হতেই বিএনপি জনসভার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে জামায়াতে ইসলামীকে আক্রমণ করছে। অন্যদিকে, জামায়াত বিএনপিকে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।
গত বৃহস্পতিবার সিলেটে জনসভার মাধ্যমে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই দিনে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি জনসভায় ভাষণ দেন। এসব ভাষণে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন এবং বলেন, ধর্মকে ব্যবহার করে দলটি মানুষকে ভুল পথে চালিত করছে।
টিকিট দেওয়ার নাম করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘দোজখের মালিক আল্লাহ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, সেটি কি অন্য কেউ দিতে পারে? দিতে পারে না।’ তিনি মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘কেউ কেউ বলে, অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি; এবার একবার আমাদের দেখেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্মানহানি হয়েছে। তাই মানুষ ইতিমধ্যেই সব কিছু দেখেই নিয়েছে।’
জনসভায় তিনি রাষ্ট্রকাঠামো রূপান্তর, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, খাল খনন ও বেকারদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন।
গত দুই দিনে জামায়াতের নেতারা বিএনপিকে আক্রমণ করেছেন এবং তারেক রহমানের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন। জামায়তে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘কোনো একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ, রাসুল ও আখিরাতকে বিশ্বাস করেন, তিনি অন্যকে কাফের বলতে পারেন না। এটি জায়েজ নয় এবং বড় অপরাধ।’ তিনি এই মন্তব্য খুলনার নির্বাচনী এলাকায় জনসভায় করেন।
জামায়াতে ইসলামের নেতা গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটি বলার তার কোনো অধিকার নেই।’
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতির জবাবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান পঞ্চগড়ে গতকাল জনসভায় ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই আমাদের ভাই-বোনেরা। আমরা আপনাদের বুকে একটি ভালোবাসার কার্ড রাখতে চাই। সেই ভালোবাসা দিয়ে আমরা বঞ্চনা, অবিচার ও দায়মুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
প্রচার শুরুর প্রথম দিন রাজধানীর মিরপুরে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগও তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতকে ঘায়েল করার জন্য বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দলটির ভূমিকা বেশি করে সামনে আনছে। এতে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ভোটব্যাংকগুলো নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচনে দেশের প্রধান দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি রয়েছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট নিজেদের ভোটব্যাংক ধরে রেখে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে। তাই বিএনপি বারবার মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি মনে করিয়ে দিচ্ছে। একাত্তরের কথা বললেই জামায়াতের বিপক্ষে ভোট যায়।
অপর দিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াত চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিএনপিকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে এবং কয়েকশ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে রাজনীতির ভাষা বলা যায় না। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির ভাষা হবে ইস্যু নিয়ে। একজন বলবে আমরা জনগণকে এভাবে সেবা দিতে চাই, আরেকজন বলবে আমরাও জনগণকে আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেবা দিতে চাই।’
ঢাকার জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না এবং কাউকে নিতে দেব না, ইনশা আল্লাহ। দুর্নীতিও আমরা করব না এবং কাউকে করতেও দেব না।’
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, জামায়াত কোনো দলের নাম না দিলেও ইঙ্গিত দিয়ে বলছে, ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি করা হবে না। এটা বোঝা যায় যে, তারা বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করছেন। তিনি বলেন, দলগুলোর সমালোচনা থাকবেই, তবে শোভনীয়তার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার অতীতে নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি মানেনি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা মনে করি, প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু অঙ্গীকার নয়, এটা নাগরিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের চুক্তি। চুক্তিগুলো ভবিষ্যতে আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায়, সেই দাবি নাগরিকদের পক্ষ থেকে করতে হবে। এজন্য উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।’

Comments
Comments