গোলটেবিল আলোচনায় উঠে এল সংখ্যালঘুদের নির্বাচনী ভয়
নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা ভয় ও আতঙ্কে থাকেন। সংখ্যালঘুদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভূমি দখল, হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা বেশি হয়েছে যখন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিল।
সোমবার দুপুরে সিলেটে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ‘প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য: সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলা হয়।
নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি হোটেলের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত আলোচনায় সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান। বক্তব্য দেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগরের সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় ধর, সিলেট মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মলয় পুরকায়স্থ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সিলেট জেলার সভাপতি বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস, ডেইলি স্টারের সিলেট প্রতিনিধি মিন্টু দেশোয়ারা, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সিলেটের ব্যুরো চিফ ইকবাল সিদ্দিকী, খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি অনিলজয় ডিকার, খাসিয়া নারী প্রতিনিধি হিলদা মুকিম এবং সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর প্রমুখ।
গোলটেবিল আলোচনায় জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মতামতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপ হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় আনা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ও নির্ভীক ভূমিকা নেওয়ার বিষয়গুলো আলোচিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের একটি মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখা উচিত, কোনো পার্শ্ব ইস্যু হিসেবে নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচিতে তাদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদেরকে ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করলেও নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম দেখা যায়। সংখ্যালঘু নাগরিকদের অনেকেই দৈনন্দিন জীবনেই অনিশ্চয়তা, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন, আর নির্বাচনের সময় এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
জিল্লুর রহমান জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সংগঠনগুলো বারবার কয়েকটি জরুরি দাবি তুলে ধরেছে—কার্যকর সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন, সংখ্যালঘুবিষয়ক সাংবিধানিক ব্যবস্থা (কমিশন বা মন্ত্রণালয়), বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব ও প্রশ্নের বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তবে এসব দাবির অগ্রগতি এখনো খুব সীমিত, যা দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনাস্থাকে আরও গভীর করেছে।
আলোচকেরা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আশা করা হচ্ছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিষ্টান সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু সেই আশা আজও পূরণ হয়নি। বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা ভয় ও আতঙ্কে থাকেন। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে।
আলোচকেরা জানান, জুলাই বিপ্লবের পর তাঁদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রান্তের মানুষের কথা অনেক সময় কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছায় না। দেশে প্রতিদিনই নতুনভাবে সংখ্যালঘু তৈরি হচ্ছে। এখন মতের মিল না হলেই অনেকে সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। মবের কারণে ভয় নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হবে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে মানুষের কাছে যেতে হবে।
আলোচকেরা বলেন, দেশে প্রায় ৮০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের কথা ও দাবি রাজনৈতিক অঙ্গীকারে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। সামনের নির্বাচনে ভোট দিতে গেলে এক ধরনের সমস্যা, আর ভোট না দিতে গেলেও অন্য ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এজন্য সবচেয়ে জরুরি হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

Comments
Comments