তারেক নিজের অর্থে, শফিকুর দলীয় তহবিলে নির্ভরশীল
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। এই ব্যয় তিনি বহন করবেন নিজের আয়ের টাকা থেকে। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে রয়েছে কৃষি খাত ও ব্যাংক আমানত।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ আসবে দলের তহবিল থেকে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নির্বাচনী ব্যয়ের প্রধান ভরসা সাধারণ মানুষ। তিনি মূলত ক্রাউড ফান্ডিং বা গণ-অনুদানের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করবেন।
একজন প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনার জন্য অর্থ পাওয়ার সম্ভাব্য উৎসের বিস্তারিত তথ্যও দিতে হয়। সেখানে উল্লেখ থাকে, কোন কোন উৎস থেকে তিনি নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য কত টাকা পেতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য অর্থ পাওয়ার সম্ভাব্য উৎসের এই বিবরণও প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আগে এই সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ২৫ লাখ টাকা। এবার সেই সীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় হবে তাঁর নির্বাচনী এলাকার ভোটারপ্রতি ১০ টাকা অথবা মোট ২৫ লাখ টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি হয়। সে হিসাবে এবার প্রার্থীরা আসনভেদে ২৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিনটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ইসি সূত্র জানায়, ভোটারের সংখ্যা অনুযায়ী ঢাকা-১৭ আসনে তিনি ৩৩ লাখ টাকার কিছু বেশি ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। আর বগুড়া-৬ আসনে তাঁর ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা হবে ৪৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে তারেক রহমান দুটি আসনেই নিজের আয় থেকে ৩০ লাখ টাকা করে সম্ভাব্য ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে দুই আসনে তাঁর মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। এই অর্থ আসবে কৃষি খাত ও ব্যাংক আমানত থেকে।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা টাকা, শেয়ার, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু এবং আসবাবসহ অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর নির্বাচনে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করেছেন ৫১ লাখ ১৬ হাজার ২০০ টাকা। এই ব্যয় তিনি ব্যবসা, পরামর্শক কার্যক্রম, কৃষি আয়, সম্মানী ভাতা এবং ব্যাংক আমানতের মুনাফা থেকে নির্বাহ করবেন। আইন অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে তিনি সর্বোচ্চ ৫১ লাখ ১৬ হাজার ২৯০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন খাত থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বার্ষিক আয় প্রায় ১২ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৩ টাকা। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ১ কোটি ৫২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮৩ টাকা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসন, মিরপুরের একাংশ ও কাফরুল এলাকা থেকে নির্বাচন করবেন। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। শফিকুর রহমানের হাতে নগদ অর্থ রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
ভোটার সংখ্যার হিসাবে জামায়াতের আমির তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য তিনি সম্ভাব্য দুটি অর্থের উৎস উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে নিজের হাতে থাকা নগদ ও ব্যাংকে জমা টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। বাকি ৩৫ লাখ টাকা আসবে জামায়াতে ইসলামীর তহবিল থেকে। এই তহবিল গঠিত হয় দলের সদস্যদের নিয়মিত অনুদানের মাধ্যমে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ৪০ লাখ টাকার কিছু বেশি ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। তিনি সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখ করেছেন ৩০ লাখ টাকা। এই ব্যয় তিনি নিজের ব্যবসা, ভাইবোনদের অনুদান এবং দলীয় তহবিল থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিচালনা করবেন।
নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের বিবরণীতে মিয়া গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেছেন, নিজের ব্যবসা থেকে তিনি ব্যয় করবেন ২ লাখ টাকা। তিন ভাই ও এক বোনের কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান হিসেবে পাবেন ৫ লাখ টাকা। আত্মীয় নন, এমন পাঁচজনের কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান হিসেবে পাবেন ৮ লাখ টাকা। আর দলীয় তহবিল থেকে অনুদান হিসেবে পাবেন ১৫ লাখ টাকা।
ঢাকা-১১ সংসদীয় আসন, খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের একাংশ থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির, এনসিপি, আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ভোটার সংখ্যার হিসাবে তিনি এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা। তাঁর নিজের নামে কোনো বাড়ি বা গাড়ি নেই এবং স্থাবর সম্পত্তিও নেই। তবে তাঁর অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৩০ লাখ টাকা।
নাহিদ ইসলাম নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য দুটি সম্ভাব্য অর্থের উৎস উল্লেখ করেছেন। তিনি মূলত ক্রাউড ফান্ডিং, অর্থাৎ গণ-অনুদানের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করবেন। সারা দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি নিজের আয় থেকে ১ লাখ টাকা ব্যয় করার কথা উল্লেখ করেছেন।
দলের আহ্বায়কের মতো এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশও আসবে ক্রাউড ফান্ডিং থেকে। তিনি রংপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। এই আসনে ৫১ লাখ টাকার কিছু বেশি ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। আখতার হোসেন সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা।
হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে আখতার হোসেনের বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসে তিনি উল্লেখ করেছেন, নিজের আইন পেশা থেকে ১ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। আর ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আসবে ৪৯ লাখ টাকা।
নির্বাচন শেষে প্রার্থীদের এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। তবে নির্বাচন কমিশন সাধারণত প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে না। নির্বাচন চলাকালে প্রার্থীরা কোথায় কত টাকা খরচ করছেন, সে বিষয়েও তদারকি করা হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সব প্রার্থীই নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়ে অনেক বেশি টাকা নির্বাচনে ব্যয় করেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের, টিআইবি, এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৫০টি আসনে গবেষণা চালায় সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচারের জন্য নির্ধারিত সময়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ব্যয় নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি ছিল। এর আগে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নির্ধারিত ব্যয়সীমার তিন গুণ বেশি টাকা খরচ করেছিলেন।
গত বছর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয়ের নিরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করার। হিসাবের মধ্যে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে নির্বাচন বাতিল করার বিধান রাখার কথাও বলা হয়েছিল। তবে ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নেতা-কর্মীদের কাছে জবাবদিহি এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশন গুরুত্ব দেয়নি। প্রার্থী ও দলের নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত প্রস্তাবও উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে টাকার প্রভাব এখন অকল্পনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ব্যয় নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। নির্বাচন শেষে যে হিসাব দেওয়া হয়, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
Comments
Comments