নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা, ইসির কঠোরতা চায় সুজন
![]() |
| ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণে অংশীজনের ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন। আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘নমনীয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে অসহিষ্ণুতা ও সহিংস প্রবণতা উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনকে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুজনের সম্পাদক এসব কথা বলেন।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণে অংশীজনের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সম্প্রতি দেশের সাতটি বিভাগ ও বিভিন্ন জেলায় নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেছেন। এসব মতবিনিময়ের ভিত্তিতেই তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমার যতটুকু মনে পড়ে, নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য এক প্রার্থীর বিষয়ে বলেছেন, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন। এটা কী কথা। এর মানে পরিষ্কার, ওই ব্যক্তি ঋণখেলাপি ছিলেন। তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র বৈধ করে দিল। পরে তাঁকে বলা হলো, যেন তিনি টাকা দিয়ে দেন। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমার মনে হয়, নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্ন রাখা দরকার, তারা ভবিষ্যতেও কি এমন আচরণ করবে। যদি করে, তাহলে সামনে আমাদের অনেক দুঃখ অপেক্ষা করছে।’
সুজনের সম্পাদক আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এখনই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করে এবং অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে না আনে, তাহলে এবারের নির্বাচনও বিতর্কিত হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে জনগণের প্রত্যাশিত সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপপ্রচারের ঝুঁকির বিষয়েও উদ্বেগ জানান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন কোনো প্রার্থী মারা গেছেন বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন—এআই ব্যবহার করে এমন অপতথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হতে পারে। এতে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালট নিয়েও বিতর্কের সুযোগ রয়েছে, যা পুরো নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ না থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত অভিযোগে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, প্রার্থীদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের তথ্য দেখে জনমনে ‘অনেক প্রার্থী তথ্য গোপন করেছেন’—এমন ধারণা জোরালো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কি বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় হলফনামার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করেছে। প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কি নমনীয় ছিল। এসব ধারণার মধ্যে সামান্য সত্যতাও থাকলে তা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে দিলীপ কুমার সরকার ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভোট দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব। তাই অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে কিংবা অন্ধ আবেগে ভোট দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে, বুঝে সৎ, যোগ্য এবং জনকল্যাণে নিবেদিত দল ও প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। তিনি দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মানবতাবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও নির্যাতনকারী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি, সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, পরিবেশ ধ্বংসকারী এবং কালোটাকার মালিক—অর্থাৎ কোনো অসৎ, অযোগ্য ও গণবিরোধী ব্যক্তিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান।
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, এবারের নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে জয় পাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় এক দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে দলের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের নেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে উল্লেখ করে সুজনের কেন্দ্রীয় এই সমন্বয়কারী বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আরেকটি সুপারিশ ছিল—দলের সাধারণ সদস্যদের গোপন ভোটে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ নির্বাচনের জন্য তিনজনের একটি প্যানেল তৈরি করা। সেই প্যানেল থেকেই দলের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। কিন্তু আরপিওতে এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। যদিও বিদ্যমান আরপিওতে প্যানেল বিবেচনায় নিয়ে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে এমন প্যানেল তৈরি করেনি এবং কেউই প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এটি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ‘অভ্যাসগত ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা’র সুপারিশ করেছিল। বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে তাঁদের তামাদি ঋণ পুরোপুরি পরিশোধের বিধান করার কথা বলা হয়েছিল। সুজনের মতে, ঋণখেলাপিদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে এই প্রস্তাবটি আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি ছিল।
নারী প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদের কথা উল্লেখ করে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে বলা আছে—জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেবে। তবে এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনয়ন পাওয়া নারীর সংখ্যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয়, দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। বরং মনোনয়নের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যান্য বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, যা হতাশাজনক।

Comments
Comments