{getBlock} $results={3} $label={ছবি} $type={headermagazine}

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেনপথে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা বাড়ছে, ২০ মাসে মৃত্যু ৩০

প্রকাশঃ
অ+ অ-

প্রতিনিধি চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের লোহাগাড়ার আধুনগরে এই লেভেল ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান। রাখা হয়নি প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ারও। গতকাল বেলা দুইটায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরুর পর তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রেলপথ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নতুন নির্মিত এই রেলপথের ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতে কোনো গেটম্যান এবং প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার নেই। এর ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে গত ২০ মাসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর ১৭ জনের এবং চলতি বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রেলপথের লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় এবং রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে এসব মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাতে ট্রেনের ধাক্কায় মারা যায় একটি হাতি।

সর্বশেষ গত শনিবার কক্সবাজারের রামুর রশিদনগর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ট্রেনের ধাক্কায় এক পরিবারের ৩ জনসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়। যে লেভেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি রেলওয়ের অনুমোদিত। তবে অরক্ষিত এই ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান ছিল না।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৩ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয় ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। নির্মাণকাজ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে। প্রথমে এক জোড়া ট্রেন চললেও এখন চলছে চার জোড়া ট্রেন।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চালু হলেও এর জন্য যে জনবল প্রয়োজনীয়, তা এখনো অনুমোদন দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। এখন প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ীভাবে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও যেসব লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যানের প্রয়োজন হবে, তা জরিপ করে ব্যবস্থা করা হবে।

সর্বশেষ গত শনিবার কক্সবাজারের রামুর রশিদনগর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ট্রেনের ধাক্কায় এক পরিবারের ৩ জনসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়। যে লেভেল ক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি রেলওয়ের অনুমোদিত। তবে অরক্ষিত এই ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান ছিল না।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে প্রতিবন্ধক গেট বা ব্যারিয়ার এবং গেটম্যান রয়েছে। বাকি ৫৬টিতে কোনো ব্যারিয়ার ও গেটম্যান নেই। অর্থাৎ এগুলো অরক্ষিত।

রেলওয়ের প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেললাইনে মোট ৯টি সেকশন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেভেল ক্রসিং গেট রয়েছে ইসলামাবাদ-রামু সেকশনে। ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেকশনে ১৭টি লেভেল ক্রসিং আছে। কিন্তু গেট ও গেটম্যান রয়েছে মাত্র একটিতে। বাকি ১৬টিতে কোনো ব্যারিয়ার বা গেটম্যান কিছুই নেই।

গত শনিবার বেলা পৌনে দুইটায় ইসলামাবাদ-রামু সেকশনের রশিদনগর লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ও চার যাত্রী নিহত হয়েছেন। এর আগেও গত বছরের ৯ নভেম্বর রামুর রশিদনগর এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবকের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার পালাকাটা এলাকায় অরক্ষিত রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় মারা যান এক মোটরসাইকেল আরোহী।

রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল মালেক বলেন, ট্রেন চালুর পর থেকে কক্সবাজারের সদর, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলোতে গেট স্থাপন, গেটম্যান নিয়োগসহ নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

একই ধরনের দাবিতে গতকাল রোববার বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপককে চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এ ছাড়া রামু-কক্সবাজার সেকশনে আটটি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র একটিতে গেটম্যান রয়েছে। ডুলাহাজারা-ইসলামাবাদ সেকশনের ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ১২টি লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান আছে একটিতে। ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ চকরিয়া-ডুলাহাজারা সেকশনে ৯টি ক্রসিং থাকলেও গেটম্যান আছেন ৩টিতে।

হারবাং-চকরিয়া সেকশনের ৪টির মধ্যে ২টিতে, লোহাগাড়া-হারবাং সেকশনের ৫টির মধ্যে ১টিতে, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সেকশনের ৮টির মধ্যে ৩টিতে গেটম্যান আছেন। বাকিগুলো উন্মুক্ত। এ ছাড়া দোহাজারী-সাতকানিয়া সেকশনে ৮টির মধ্যে ৪টিতে এবং হাসিমপুর-দোহাজারী সেকশনের ১টি গেটে কোনো গেটম্যান নেই।

যেসব লেভেল ক্রসিংয়ে যানবাহনের চলাচল বেশি ও ব্যস্ততম, সেগুলোতে অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার দিতে হবে। সার্বক্ষণিক গেটম্যান রাখতে হবে। আর বাঁকের কারণে যেসব সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় ট্রেন দেখা যায় না, সেখানেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।

— অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম, সাবেক শিক্ষক, পুরকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. সবুক্তগীন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন নির্মিত কক্সবাজার রেলপথের সব লেভেল ক্রসিং গেট অনুমোদিত। কিছু কিছু জায়গায় লোকবল দেওয়া সম্ভব হলেও কিছু ক্ষেত্রে হয়নি। তবে সব গেটের আগে সতর্কতামূলক লেখা ও ফলক আছে। আর কক্সবাজার রেলপথ নিরাপদ করতে মানুষের চলাচলের জন্য ৪৬টি আন্ডারপাস করা হয়েছে। তাড়াহুড়া না করে নিরাপদে রেললাইন পারাপার করার জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এতে দুর্ঘটনা অনেক কমবে।

যে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে প্রকৌশল বিভাগ জরিপ করবে বলে জানান মহাব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, যদি গেট ও গেটম্যানের প্রয়োজন হয়, তা অনুমোদনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সড়কে রেললাইনের পাশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। গতকাল বেলা দুইটায় লোহাগাড়ার আধুনগর ইউনিয়নে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আধুনগর উচ্চবিদ্যালয়ের ২০০ মিটার পশ্চিমে তিন পথের মাথা সড়কে একটি লেভেল ক্রসিং গেট আছে। গতকাল বেলা দুইটায় সরেজমিনে দেখা যায়, এই লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেট নেই। তবে সড়কে রেললাইনের দুই পাশে দুটি করে পথচারী ও চালকদের জন্য সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড আছে। একটি সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘সাবধান! এই গেটে কোনো গেটম্যান নাই। পথচারী ও সকল প্রকার যানবাহন নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন। যেকোন দুর্ঘটনার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না।’ আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘সাবধান! সামনে রেলপথ।’

তবে এসব সতর্কতা মানছেন না পথচারী ও চালকেরা। ট্রেন আসার হুইসেলের শব্দ শুনেও তাড়াহুড়া করে রেলপথ অতিক্রম করতে দেখা গেছে পথচারী ও গাড়িচালকদের। এই লেভেল ক্রসিংয়ের ২০০ মিটার উত্তরে বাঁক থাকায় এবং গাছপালার কারণে ট্রেন দেখা যায় না। এতে ঝুঁকি বাড়ে।

আধুনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনপথের মাথা সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন বড়হাতিয়া ও আধুনগর ইউনিয়নের পাঁচ হাজার পথচারীকে রেললাইন অতিক্রম করে গন্তব্যে যেতে হয়। তাই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়কের এ লেভেল ক্রসিংয়ে দ্রুত গেটম্যান না দিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, যেসব লেভেল ক্রসিংয়ে যানবাহনের চলাচল বেশি ও ব্যস্ততম, সেগুলোতে অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার দিতে হবে। সার্বক্ষণিক গেটম্যান রাখতে হবে। আর বাঁকের কারণে যেসব সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় ট্রেন দেখা যায় না, সেখানেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন