[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

চারুকলায় পড়ব

প্রকাশঃ
অ+ অ-

ড. মো. মফিদুল আলম খান

রংতুলিতে স্বপ্ন বুনন করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যমী শিক্ষার্থী, নিলুফার শিরিন হ্যাপী | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

মানুষের সবচেয়ে ঐশ্বর্যময়, স্থায়ী, ক্রিয়াশীলতা হলো তার সৃজনশীল সৃষ্টি। সমাজে সৃজনশীল পেশা অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। সৃজনশীল শিল্পকলা দিয়ে সমাজ, জাতি, দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সুন্দর, মননশীল, মানবিক এবং দীর্ঘস্থায়ী করে অনন্তকাল সভ্যতায় টিকিয়ে রাখা হয়। তেমনই এক সৃষ্টিশীল পড়াশোনার বিভাগ হলো চারুকলা। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে চারুকলা নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। আজকের আয়োজনে চারুকলায় ক্যারিয়ার, গুরুত্ব, যোগ্যতা, বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক
 
ইতিহাস
বাংলার শিল্পকলা তথা শিল্প-সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো। সময় এবং সভ্যতার বিবর্তনে বৃহৎ বাংলা তথা ভারতবর্ষে ভ্রমণ, ব্যবসা, ধর্মপ্রচার, বসবাস কিংবা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ফরাসি, পাঠান, মোগল এবং ইংরেজদের আগমন ঘটেছে। প্রাসঙ্গিকভাবেই তাদের শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮ সাল) পর সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্স সাধিত হয়। শিল্পকলার ক্ষেত্রে রেনেসাঁর অবলুপ্তি ঘটে এবং অবমুক্ত হয় নতুন-নতুন বিষয়বস্তু, যুক্ত হয় আধুনিক উপকরণ ও করণকৌশল। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পীরা এই আধুনিকতায় যুক্ত হয়েছেন আরও অনেক পরে। পাকিস্তান আমলে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আটর্স’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন’-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তার কর্মোদ্যম, কর্মোদ্যোগের ফলে আমাদের শিল্পাঙ্গন সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সেসব স্থানে অসংখ্য চারুশিল্পীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার সমসাময়িক এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের অন্য কোনো শিল্পী এবং বর্তমান সময়ের প্রথম সারির কোনো শিল্পী এ ধরনের কোনো শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিষয় যুক্ত করা, দেশের বিভিন্ন স্থানে আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। চারুকলা সম্পর্কে বর্তমান সমাজে কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অনভিপ্রেত ধারণা দূর হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমে চারুকলা বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কর্মক্ষেত্র
চারুকলা শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, অন্যদিকে চারশিল্পীদের কর্মক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে। দেশের ৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ৭টি আর্ট কলেজ, জেলা পর্যায়ে প্রতিটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল, বেসরকারি প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্কুল, জেলা পর্যায়ে পিটিআই, প্রতিটি জাদুঘর, শিল্পগ্যালারি, প্রকাশনী, প্রতিটি পত্রিকা, টেলিভিশন, অ্যাডভার্টাইজিং ফার্ম, ফ্যাশন হাউজ, বিনোদন পার্ক, প্রতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রুপ অব কোম্পানি ইত্যাদি শিল্প-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চারুশিল্পীদের কর্মক্ষেত্র অবারিত হয়েছে। একজন চারুশিল্পী তার সৃজনশীলতায় এসব ক্ষেত্রে আধুনিকতা, আন্তর্জাতিকতা আনয়ন করে সমাজ, জাতি এবং দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে কালোত্তীর্ণ করেন। উল্লিখিত প্রতিটি ক্ষেত্রকে আরও ব্যবহরোপযোগী, দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় করে তুলতে চারুশিল্পীরা নিরন্তর কাজ করছেন। শিল্পী শুধু নিজের প্রশান্তির জন্য, নান্দনিকতার জন্য, শৌখিন গ্রাহকের চাহিদা পূরণের জন্যই শিল্প তৈরি করেন না, শিল্পী এবং শিল্প এখন প্রতিটি মানুষের, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের, প্রতিটি সমাজের প্রাত্যহিক প্রয়োজনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

যোগ্যতা
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা বিষয়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস হতে হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফলাফলের ভিত্তিতে আবেদন করতে হয়। তার পর লিখিত পরীক্ষা (শিল্পকলা, সাহিত্য, সমসাময়িক বিষয়ে) এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা (ড্রইং বিষয়ে) দিতে হয়। এসএসসি, এইচএসসি, লিখিত পরীক্ষা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উত্তীর্ণ মেধাক্রমানুসারে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফলাফলের ভিত্তিতেই ভর্তি হওয়া যায়। কোনো লিখিত পরীক্ষা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয় না। শুধু সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ভর্তি হওয়া যায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা বিষয়ে ৩ বছর মেয়াদে অনার্স এবং ২ বছর মেয়াদে মাস্টার্স চালু রয়েছে।

আর্ট কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের অধীনে। আর্ট কলেজগুলোতে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ২ ধরনের পদ্ধতি বিদ্যমান রয়েছে। প্রথমত, প্রিবিএফএ (প্রিলিমিনারি ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস, এইচএসসি সমমান), বিএফএ (ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস, অনার্স সমমান)। দ্বিতীয়ত, অনার্স। প্রথমত, প্রিবিএফএ ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস করে নির্ধারিত ফলাফলের ভিত্তিতে আবেদন করে কোনো লিখিত পরীক্ষা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ভর্তি হওয়া যায়। ২ বছর মেয়াদে প্রিবিএফএ পাস করে ৩ বছর মেয়াদে বিএফএ ভর্তি হওয়া যায়। অনার্স ভর্তির ক্ষেত্রে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস করে নির্ধারিত ফলাফলের ভিত্তিতে আবেদন করে কোনো লিখিত পরীক্ষা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ভর্তি হওয়া যায়। প্রিবিএফএ পাস করে অনার্সে ভর্তি হওয়া যাবে, তবে শিক্ষার্থীর বয়স ২২ বছরের মধ্যে থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রিবিএফএ, বিএফএ এবং অনার্স চালু আছে নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজ, এসএস সুলতান ফাইন আর্ট কলেজ এবং ঢাকা আর্ট কলেজে।

কোথায় পড়াশোনা করা যাবে
দেশে বর্তমানে ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে চারুকলা বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ ও শান্তমারিয়াম ইউনিভার্সিটি। এ ছাড়া আর্ট কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজ, বগুড়া আর্ট কলেজ, রাজশাহী আর্ট কলেজ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউট (ময়মনসিংহ), এসএস সুলতান ফাইন আর্ট কলেজ (যশোর), ঢাকা আর্ট কলেজ (ঢাকা), সুলতান বেঙ্গল ফাইন আর্ট কলেজ (নড়াইল)।

যে বিষয়গুলো পড়ানো হয়

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্ট কলেজগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমে বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে চারুকলা শিক্ষা কার্যক্রমে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, প্রাচ্যকলা, গ্রাফিক্স ডিজাইন, মৃৎশিল্প, কারুশিল্প, শিল্পকলার ইতিহাস, ফ্যাশন ডিজাইন এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইন চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা অনুষদে শিল্প-সংরক্ষণ বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।  

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন