প্রতিশ্রুতি পূরণে কত দূর এগোল সরকার
সরকারি দল বিএনপির মতে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনও আট মাস পূর্ণ হয়নি। তাই সব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং সামনে পর্যাপ্ত সময় রয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই পূরণ করা হয়েছে বলে দাবি করছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। কিছু প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, আবার কিছু রয়েছে বাস্তবায়নের পথে। তবে রাষ্ট্রীয় নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সরকার গঠন, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি দল বিএনপির মতে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনও আট মাস পূর্ণ হয়নি। তাই সব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং সামনে পর্যাপ্ত সময় রয়েছে।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর পর পূর্বাচলে নিজের প্রথম জনসভায় তিনি ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’ উল্লেখ করে প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতা ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনী ইশতেহার ও জেলা পর্যায়ের সমাবেশগুলোতেও একই ধরনের অঙ্গীকার করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে নারীপ্রধান পরিবারের জন্য পারিবারিক কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের সম্মানী প্রদান, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নতুন সরকারি বেতন স্কেল ঘোষণা এবং খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে মানবাধিকার লঙ্ঘন না করা, স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা, বিটিভিতে বিরোধী দলের সংবাদ প্রচার, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালে রায় হওয়ার বিষয়টিকেও প্রতিশ্রুতি পূরণের উদাহরণ হিসেবে দেখাচ্ছে তারা।
তবে রাষ্ট্রীয় নিয়োগে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সরকার গঠন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, নির্বাচিত প্রতিনিধি বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ, ডেপুটি স্পিকার পদ প্রদান ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক বলেন, সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট, আইনশৃঙ্খলা ও বাজার পরিস্থিতি এখনও অসহনীয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো হলেও বড় প্রকল্পগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। জাতীয় সরকার ও ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে উন্নতি হলেও রাজনৈতিক সূচকে পিছিয়ে রয়েছে সরকার।
বিএনপির প্রতিশ্রুতিতে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে রাজনীতিমুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা।
জোটের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। প্রথম দফায় জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর ও ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ আগস্ট আন্দালীব রহমান পার্থকে মন্ত্রী করা হলেও অন্য জোটসঙ্গীদের সরকারে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে উবায়দুল্লাহ ফারুকসহ অন্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সরকার তাঁদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছে।
দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার কথা থাকলেও শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। বেড়েছে প্যাকেটজাত দ্রব্যের দামও। সরকার বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে এর জন্য দায়ী করছে, আবার বাণিজ্যমন্ত্রী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের কথা জানিয়েছেন।
শিল্প খাত ও গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অঙ্গীকার থাকলেও বিরোধীদের দাবি, এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ব্যবসায়ীদের দ্রুত পরিস্থিতি উন্নতির আশ্বস্ত করেছেন।
নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার কথা বলা হলেও ১২টি সিটি করপোরেশন ও সব জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীরা একে দলীয়করণের অংশ হিসেবে দেখছে। অবশ্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতেও দলীয়ভাবে নিয়োগের নজির রয়েছে।
ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার কথা বলেছিল বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও শুরুতে তেমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার না হওয়ায় এতে সায় দেয়নি বিরোধী দল। পরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রস্তাবটি স্রেফ মৌখিক ছিল, লিখিত নয়।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদেও বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সরকার শুরুতে কিছু পদ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও সংবিধান সংস্কারবিষয়ক কমিটিতে বিরোধী দল সদস্যদের নাম না দেওয়ায় সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। তবে এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখনও রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
বিএনপি প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে জামায়াত। সাইফুল আলম খান মিলনের মতে, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা না ফেরা সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেলে না। স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগকেও দলীয় আধিপত্যের উদাহরণ বলে মনে করেন তিনি।
গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উপদেষ্টা মাহদি আমিন বলেন, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে পূরণ হয়েছে এবং বাকিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
একই সুর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, দ্রুততার সঙ্গে বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে পারিবারিক কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি অন্যতম। তাঁর দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো এবং গত সাত মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা শতাধিক অধ্যাদেশ প্রথম সংসদ অধিবেশনেই আইনে পরিণত করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তবে সব প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।