পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

আধুনিক জীবনে নির্জনতা, একাকিত্বের চেয়ে কি আলাদা?

জীবনযাপন ডেস্ক
কোলাহল থেকে দূরে নিজের সঙ্গে কাটানো সময় কেবল ফ্যাশন নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর এক প্রতিষেধক। মডেল: ড. শেখ সোহা
কোলাহল থেকে দূরে নিজের সঙ্গে কাটানো সময় কেবল ফ্যাশন নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর এক প্রতিষেধক। মডেল: ড. শেখ সোহা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

জীবনের ব্যস্ততা, কোলাহল এবং সারাক্ষণ পর্দা ও বিজ্ঞাপনের ভিড়ে আমাদের মন অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই ক্লান্তিকর জীবনে একটু শান্তি আনতে মানুষের কত আয়োজন! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অনেকেই নিজেদের একাকী জীবনের প্রশান্তির মুহূর্তগুলো তুলে ধরছেন। কাজ থেকে ফিরে এক কাপ চা হাতে মোমবাতির আলোয় নিজের সঙ্গে সময় কাটানো, একা একা সিনেমা দেখতে যাওয়া, বই পড়া কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একাই ঘুরতে যাওয়া—এসব এখন অনেকের জীবনের অংশ।


একাকিত্ব এখন আর বিষাদময় কিছু নয়। বরং নিজেকে মানসিক ও আত্মিকভাবে উদ্দীপ্ত করার আধুনিক একটি উপায়। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদের হাত ধরে এসেছে এই নতুন জীবনধারা। একে বলা হচ্ছে নির্জনতা। নির্জনতা একটি নতুন ও আকাঙ্ক্ষিত জীবনশৈলী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। টরন্টোর সফটওয়্যার বিক্রয় ব্যবস্থাপক লানা ইসা বা ডেভন নোইরিংয়ের মতো কনটেন্ট নির্মাতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একা থাকার জীবনের দৈনন্দিন মুহূর্ত তুলে ধরে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করছেন।


একাকিত্ব এবং নির্জনতার মধ্যে পার্থক্য আছে

অনেকেই একাকিত্ব ও নির্জনতা—এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একাকিত্ব এমন এক অনুভূতি, যা বাধ্য হয়ে বা পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়। এটি মানুষকে বিষণ্ন ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। অন্যদিকে নির্জনতা একটি সচেতন নির্বাচন। যখন কেউ নিজের ইচ্ছায় অন্যদের কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে নিজের সঙ্গে সময় কাটায়, তাকেই নির্জনতা বলা হয়। বিখ্যাত কবি রুপি কাউর লিখেছেন, ‘একাকিত্ব হলো এই কথা মনে করিয়ে দেওয়ার সংকেত যে আপনার এখন নিজের নিজেকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’


কেন জীবনে নির্জনতা জরুরি

কোলাহল থেকে দূরে নিজের সঙ্গে কাটানো এই সময় কেবল একটি চল নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্জনতার কিছু উপকারিতা আছে। সেগুলো হলো—


মানসিক স্পষ্টতা ও নিজেকে জানা: দিনের ব্যস্ততায় বহু মানুষের মতামতের ভিড়ে আমরা নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলি। নির্জনতায় মনের ঘোলা পানি থিতিয়ে আসে। নিজের জীবনের ভালো-মন্দ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে এই শান্ত পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধার: সমাজে সব সময় সুন্দর ও সামাজিক হয়ে চলা বেশ ক্লান্তিকর। একা থাকা মানুষকে সেই সামাজিক চাপ বা নিজেকে সব সময় অন্যদের সামনে তুলে ধরার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়। এর ফলে নতুন উদ্যমে শক্তি সঞ্চার করা সম্ভব হয়।


কঠিন অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হওয়া: শোক, লজ্জা, ভয় বা হতাশা—আমাদের ভেতরে জমতে থাকা এই কঠিন অনুভূতিগুলো সামলানো বা প্রকাশ করার জন্য নির্জনতাই একমাত্র নিরাপদ জায়গা।


সৃজনশীলতার বিকাশ: ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বের বড় বড় চিন্তা, সাহিত্য বা শিল্পকলার জন্ম হয়েছে নির্জনতায়। পাবলো পিকাসো বা গ্যাটের মতো বিশ্বখ্যাত স্রষ্টারা সব সময় মানতেন, নির্জনতা ছাড়া কোনো বড় বা মৌলিক সৃষ্টি অসম্ভব।


সত্যিকারের আত্মপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস: যে মানুষ নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসে, সে কখনো একা হওয়ার ভয়ে ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে না। নির্জনতা মানুষের নিজের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।


একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের আহ্বান

তবে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি-সংক্রান্ত গবেষক মেলোডি ডিং সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, মানুষ সামাজিক জীব। তাই দীর্ঘদিনের চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা নিজেকে পুরোপুরি সমাজ থেকে কেটে ফেলা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। নির্জনতা হলো সাময়িক বিরতি, যা মানুষকে আরও সুস্থভাবে সমাজে ফিরে আসতে সাহায্য করে।


সব মিলিয়ে, বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানো তথাকথিত ‘নিখুঁত জীবন’-এর ভিড়ে একা থাকা উদ্‌যাপনের এই প্রবণতা বহু মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে। জীবন ছকে বাঁধার বিষয় নয়। অন্যদের সঙ্গে থাকার পাশাপাশি মাঝে মাঝে নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের চাবিকাঠি।


সূত্র: বিবিসি

জীবনধারা থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.