এলপিজি সংকট, বেড়েছে দামও, কী কারণ
দাম নির্ধারণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভাষ্য, দেশে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। কারা সরবরাহ কমিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।
আমদানির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলেও দেশে সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের হঠাৎ সংকট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে স্থানভেদে ১২ কেজির সিলিন্ডারেই ৬০০ টাকা অতিরিক্ত নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। সিলিন্ডারের আকার অনুযায়ী অন্তত ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট কিছুটা কমতেই নতুন করে বিপাকে পড়েছেন এলপিজির গ্রাহকেরা।
দাম নির্ধারণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভাষ্য, দেশে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। কারা সরবরাহ কমিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।
কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা সরকারনির্ধারিত দামেই সরবরাহ করলেও ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা করছেন। অন্যদিকে ডিলারদের ভাষ্য, আগামী মাসে (অক্টোবর) দাম বাড়ার আশায় কোম্পানিগুলোই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অসাধু এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁরা। তদারকি ও নজরদারির অভাবেই বাজারে এমন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
পাইপলাইনের গ্যাস-সংকট ও নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় বাসাবাড়ির পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানগুলো এখন সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে বাজার থেকে অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নেওয়াই এই কৃত্রিম সংকটের মূল উদ্দেশ্য।
গতকাল শনিবার রামপুরার এক চা-দোকানি মনির হোসেন জানান, চলতি মাসের শুরুতে ১২ কেজির সিলিন্ডার তিনি ১ হাজার ৬০০ টাকায় কিনেছিলেন। কিন্তু গতকাল সেই সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
বিইআরসির নির্ধারিত হার অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা (প্রতি কেজি ১২১ টাকা ৩২ পয়সা)।
যাত্রাবাড়ীর দনিয়াতেও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। দনিয়ার রসুলপুরের এক বাসিন্দা জানান, ৩৩ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার তিনি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় কিনেছেন, যার নির্ধারিত দাম ৪ হাজার ৩৬০ টাকা। দোকানিদের দাবি, সরবরাহ না থাকায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
রামপুরার বনশ্রী ও মেরাদিয়া এলাকার একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানান, কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্ল্যান্টে ট্রাক পাঠিয়ে দিন কেটে গেলেও গ্যাস মিলছে না, যা পরিবহন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে কোম্পানিগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) মহাসচিব আহসান জব্বার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্য ও জাহাজভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। ফলে কিছু অপারেটর সময়মতো কাঁচামাল আনতে পারছে না। তবে যেসব কোম্পানি আমদানি করছে, তারা নির্ধারিত দামেই সরবরাহ দিচ্ছে। মূলত ডিলার ও পরিবেশকেরাই বেশি লাভের আশায় সিলিন্ডার মজুত করছে।
পাল্টা জবাবে রকিবুল হাসান নামের এক ডিলার বলেন, বেশ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। আগামী মাসে দাম বাড়বে—এমন ধারণাতেই তারা সরবরাহ আটকে রাখছে। প্ল্যান্টে ট্রাক বসিয়ে রাখার খরচও দিন দিন বাড়ছে।
দেশে বছরে গড়ে ১০ শতাংশ হারে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। প্রতি মাসে স্বাভাবিক চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার টন হলেও আগস্টে পাইপলাইনের গ্যাস-সংকটের কারণে তা আরও ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফ্রেশ, যমুনা, বসুন্ধরা, বিএম এনার্জি ও ওমেরাসহ ১২টি প্রধান কোম্পানি বাজারে সরবরাহ দিয়ে থাকে।
সার্বিক বিষয়ে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান বলেন, আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল এবং চলতি সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ পর্যন্ত এসেছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। ফলে সরবরাহে ঘাটতির বিষয়টি সত্য নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও জাহাজভাড়া বাড়লেও দেশে এ ধরনের সংকট হওয়ার কথা নয়।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিইআরসির ভূমিকা সম্পর্কে তিনি জানান, কমিশন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। প্রয়োজন হলে এলপিজি অপারেটরদের ডেকে সমস্যা শুনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।