নতুন বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে জোর দিচ্ছে বিএনপি সরকার। এতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও অনেক বেশি ধরা হয়েছে। বাজেট বড় হওয়ায় বড় হচ্ছে বাজেট ঘাটতিও। আর সেই ঘাটতি পূরণে ঋণও নিতে হবে বেশি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর জীবনের প্রথম বাজেট। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিএনপি সরকারেরও এটি প্রথম বাজেট।
অর্থমন্ত্রীর চাওয়া, বাজেটের সুফল এবার তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাক। এর অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়ে হতে পারে দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পরিবার কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত হচ্ছে। তিনি সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চান এবং মনোযোগ দিচ্ছেন সহজে ব্যবসা-বাণিজ্য করার পরিবেশ তৈরিতেও।
“বাজেট বড় হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটের কতটা বাস্তবায়ন হবে।”
— জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়
অর্থমন্ত্রী চান ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’, যার প্রতিফলন তিনি বাজেটে দেখাবেন বলে কয়েকবারই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রে তিনি ‘ডিরেগুলেশন’ করবেন অর্থাৎ যতটা সম্ভব সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনবেন।
এদিকে অর্থের টানাপোড়েনের মধ্যেও আগামী অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাজেটে নতুন বেতনকাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকতে পারে।
পাশাপাশি প্রথমবারের মতো এবার ‘সিটিজেনস বাজেট’ বা নাগরিকদের জন্য বাজেট বিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে বাজেটকে সহজভাবে বোঝা যাবে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর জীবনের প্রথম বাজেট। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিএনপি সরকারেরও প্রথম বাজেট এটি।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেট এর চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১৯ শতাংশ বড়। অর্থমন্ত্রী কয়েকবারই বড় বাজেট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাজেট বড় হলে ব্যয় বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এফবিসিসিআইয়ের পরামর্শক সভায় অর্থমন্ত্রী খোলামেলাই বলেছেন, অর্থনীতি যে জায়গায় আছে, ব্যয় বাড়িয়ে একে ওপরের দিকে না নিয়ে গেলে চলবে না।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, বর্তমানে যা ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে 6 লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়া যাবে ধরে নিয়ে এবার মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াচ্ছে ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি।
এফবিসিসিআইয়ের পরামর্শক সভায় অর্থমন্ত্রী খোলামেলাই বলেছেন, অর্থনীতি যে জায়গায় আছে, ব্যয় বাড়িয়ে একে ওপরের দিকে না নিয়ে গেলে চলবে না।
বাজেটের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই আদায় করতে হবে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। সংস্থাটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদায় করেছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হলেও জুলাই-এপ্রিল সময়ের ১০ মাসে ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এই ১০ মাসে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরে এনবিআর-বহির্ভূত আয় ধরা হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছিল মাত্র ৮ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে কর ব্যতীত প্রাপ্তি (এনটিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনটিআর থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়া যাবে ধরে নিয়ে এবার মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি।
আগামী অর্থবছরে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হতে পারে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে অর্থ বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, এবার সুদ ব্যয়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের বিপরীতে এই সুদ দিতে হবে।
সুদ ব্যয়কে বলা হয় ‘বাধ্যতামূলক ব্যয়’। সরকারের পরিচালন ব্যয় বা অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে এটি এখন বিবেচিত হচ্ছে। এই ব্যয় এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা বাজেটের অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতগুলোকে প্রবল চাপের মুখে ফেলছে।
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে থাকছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথাও ঠিক করেছে।
আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) আকার ধরা হচ্ছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এবার বাজেট ঘাটতি হবে (অনুদান বাদ দিয়ে) জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে নিট (প্রকৃত) ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকার বাস্তবে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়, যার মধ্য থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আগের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে।
“বাজেট বড় হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাজেটের কতটা বাস্তবায়ন হবে। এক বছরে এত রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি কি সম্ভব? আবার ব্যয় বা ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে যত ঋণ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, তার বাস্তবতা কম। ফলে ব্যয় ঠিক রাখতে গিয়ে সরকার ভর করবে ঘুরেফিরে ওই অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর, যার সহজ উৎস হচ্ছে ব্যাংকঋণ।”
— বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাজেটের এই রূপরেখা নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাজেট বড় হচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর কতটা বাস্তবায়ন হবে। এক বছরে রাজস্ব আহরণে এত বড় প্রবৃদ্ধি কি আদৌ সম্ভব? আবার ব্যয় বা ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে যত ঋণ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, তার বাস্তবতা কম। ফলে ব্যয় ঠিক রাখতে গিয়ে সরকার ঘুরেফিরে সেই অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই ভর করবে, যার সবচেয়ে সহজ উৎস হলো ব্যাংকঋণ।
জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকঋণ বেশি নিলে ব্যক্তি খাত কম ঋণ পাবে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে এতে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান—এগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন মূল্যস্ফীতি কমাতেও সরকার তেমন কিছু করতে পারবে না।’