পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রকাশে বিধিনিষেধ কেন

সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মাধ্যমের পাশাপাশি গণমাধ্যমের কথাও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে

প্রতিনিধি চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি ও ভিডিও ধারণের পাশাপাশি গণমাধ্যমে বন্দরের ‘অপারেশনাল তথ্য’ প্রকাশেও বিধিনিষেধ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের তথ্য প্রকাশ ও প্রচারকে ‘সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলা হয়েছে নতুন এক নির্দেশনায়।


গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মাধ্যমের পাশাপাশি গণমাধ্যমের কথাও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে বন্দরের ‘অপারেশনাল তথ্য’ বলতে ঠিক কোন ধরনের তথ্য বোঝানো হয়েছে, তা নির্দেশনায় পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে জাহাজ আসা-যাওয়া, কনটেইনার ওঠানামা, পণ্য খালাস, জট, টার্মিনালের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার মতো নিয়মিত প্রকাশিত তথ্যও এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।


এমন এক সময়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হলো, যখন চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি বিদেশি পরিচালনাকারীর হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্দোলন চলছে। এই প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। চুক্তি করা হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।


বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘ক’ শ্রেণির কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন বা কেপিআই। তাই এর নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সংবেদনশীল স্থাপনার সুরক্ষা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মাধ্যম, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার বিন্যাস ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা গ্রহণযোগ্য নয়।


একই সঙ্গে বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নজরদারি ও যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ছবি, ভিডিও, নকশা বা দৃশ্যমান তথ্য অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।


নির্দেশনায় আরও বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের কারণে বন্দর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


নির্দেশনার পক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ১২ ধারা এবং ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষ আইনের ১২ ধারার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বন্দরের সুষ্ঠু পরিচালনা ও সর্বসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্দরসীমার সব স্থান ও স্থাপনাকে সংরক্ষিত বন্দর এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


তবে এই ধারা মূলত বন্দর এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সংবাদমাধ্যমে বন্দরের সাধারণ কার্যক্রম বা অপারেশনাল তথ্য প্রকাশে সামগ্রিক বিধিনিষেধ দেওয়ার বিষয়টি ওই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা নেই।


অন্যদিকে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কথাও উল্লেখ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল স্থান, তথ্য, নকশা, ছবি বা অন্য উপাত্ত অনুমতি ছাড়া ধারণ, প্রকাশ বা প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য হতে পারে।


এখানে প্রশ্ন উঠেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কোন স্থাপনা বা কোন ধরনের তথ্য সংবেদনশীল বা সংরক্ষিত হিসেবে গণ্য হবে, তার সীমা কোথায়। বিশেষ করে জাহাজ আসা-যাওয়া, কনটেইনার ওঠানামা, পণ্য খালাস, জট, উৎপাদনশীলতা, টার্মিনালের সক্ষমতা কিংবা পরিচালন পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিতভাবেই বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নতুন নির্দেশনায় ব্যবহৃত ‘অপারেশনাল তথ্য’ শব্দের মধ্যে এসব তথ্যও পড়বে কি না, তা পরিষ্কার করা হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির অবস্থান কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতা–কর্মীরা। গত সোমবার সকালে বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের বাইরে। ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

জানতে চাইলে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, সম্প্রতি বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারও করছেন। এতে বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই নির্দেশনাটি দেওয়া হয়েছে।


গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও কেন বিধিনিষেধ দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই নির্দেশনায় গণমাধ্যমের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ, গণমাধ্যম সব সময় বন্দরের অনুমতি নিয়েই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। গণমাধ্যমের তথ্য ও ছবি প্রকাশে কখনো সমস্যা হয়নি, হবেও না।’


তবে নির্দেশনায় শুধু সংরক্ষিত এলাকায় ছবি বা ভিডিও ধারণের কথা বলা হয়নি। সেখানে গণমাধ্যমে ‘অপারেশনাল তথ্য’ প্রকাশের কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্দেশনাকে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল মনে করছেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ। তিনি বলেন, ‘শত বছরের পুরোনো আইনের দোহাই দিয়ে বন্দর যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা গণমাধ্যমকে আটকানোর কৌশল। নিরাপত্তার বিষয়টি অজুহাত। বন্দর যদি একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে এটি করে, তাহলে সরকারের ওপরও এর দায় বর্তাবে। সুতরাং সরকারকে এ বিষয়ে সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.