নিষেধাজ্ঞার ঠিক আগে কক্সবাজারে ট্রলারবোঝাই ইলিশ, কমল কি দাম
মাঝারি আয়ের মানুষের ভরসা যে ছোট ইলিশে, তার দামও কেজিতে ৮০০ টাকার ওপরে
কিছুদিন ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার পর অক্টোবর মাসের শুরু থেকে কক্সবাজার উপকূলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়েনি। বড় ও মাঝারি আকারের ইলিশের দাম এখনো ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। মাঝারি আয়ের মানুষের ভরসা যে ছোট ইলিশে, তার দামও কেজিতে ৮০০ টাকার ওপরে।
কক্সবাজার জেলায় ছোট-বড় ৬ হাজার ট্রলারে কাজ করেন প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার জেলে। সাগরে এখন বিপুল ইলিশ ধরা পড়লেও আর এক দিন পর শুরু হতে যাওয়া নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার কীভাবে চলবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তাঁরা। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৮ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা শুরুর ঠিক আগে ট্রলারের জালে বিপুল ইলিশ ধরা পড়ছে, চড়া মূল্যে তা বিক্রিও হচ্ছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় ঘনিয়ে আসায় আর ইলিশ আহরণ করা যাবে না। উপকূলে ইলিশ এলেও ধরার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় হতাশ তাঁরা।
কক্সবাজার উপকূলে ধরা পড়া অধিকাংশ ট্রলারের ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ কেনাবেচা হয় শহরের নুনিয়াছটা ফিশারিঘাটে অবস্থিত সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গভীর সাগর থেকে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরে বিক্রির জন্য ফিশারিঘাটে ভিড়েছে অন্তত ৪৫টি ট্রলার। প্রতিটি ট্রলারেই অন্যান্য মাছের সঙ্গে ইলিশ রয়েছে। কোনো ট্রলারে তিন শ, আবার কোনো ট্রলারে আড়াই হাজারের বেশি ইলিশ পড়েছে। এ ছাড়া মাইট্যা, গুইজ্যা, পোপা, কামিলা, রুপচান্দাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছও রয়েছে ইলিশের সঙ্গে।
‘এফবি সোহেল’ নামের একটি ট্রলারে ধরা পড়েছে ২ হাজার ৪০০টি ইলিশ। সকাল সাড়ে ৯টায় সেই ইলিশ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নেওয়া হলে ৩০-৪০ জন ব্যবসায়ী তা কেনার জন্য ভিড় জমান। ট্রলারের মাঝি আবদুল মুনাফ (৫৫) ইলিশগুলোর দাম চান ৫০ লাখ টাকা। দর-কষাকষির পর তিনজন ব্যবসায়ী মিলে ইলিশগুলো ৪৪ লাখ টাকায় কিনে নেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীদের একজন সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই ইলিশ ঢাকার বাজারে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হবে। দেশের অন্য কোথাও তেমন ইলিশ ধরা পড়ছে না বলে দাম এখনো চড়া।
ট্রলারের মাঝি আবদুল মুনাফ বলেন, উপকূল থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে জাল ফেললে ইলিশ ধরা পড়ছে। তিন দিন আগে ১২ জন জেলে ট্রলার নিয়ে সাগরে নামেন এবং গত রোববার রাতে ইলিশগুলো জালে আটকায়। সাগরে ইলিশ এখন ঝাঁক বেঁধে চলাফেরা করছে।
খুরুশকুলের আরেকটি ট্রলারের জেলেরা ১ হাজার ১০০ ইলিশ বিক্রি করে ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা পেয়েছেন। ট্রলারের জেলে কবির আহমদ (৪৭) বলেন, বন্ধের ঠিক আগে গভীর সাগরে বিপুল ইলিশ ধরা পড়লেও ভাগ্য খারাপ। দুই দিন পরেই ইলিশ আহরণের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে।
ফিশারিঘাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে পাইকারিতে ১ কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়, ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় এবং ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। তবে বেশির ভাগ ইলিশের ওজনই ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মধ্যে। মাঝারি আকারের অধিকাংশ ইলিশের পেটে ডিম রয়েছে বলে জানান জেলেরা।
ফিশারিঘাটে ট্রলারের ইলিশ কিনে তা বরফ দিয়ে কার্টনে সংরক্ষণ করে ট্রাকে করে ঢাকায় সরবরাহ করছেন ৫০ জনের বেশি মাছ ব্যবসায়ী। রাজধানীতে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দামও চড়া। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফিশারিঘাট থেকে দুটি ট্রলারে ৫ মেট্রিক টন ইলিশ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে জানিয়ে কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, কক্সবাজার উপকূলে আহরিত ইলিশের ৯০ শতাংশই ঢাকায় সরবরাহ করা হয়।
ইলিশের দাম না কমার কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের কোথাও তেমন ইলিশ ধরা পড়ছে না। তাই ইলিশের চাহিদা বেশি। এ কারণেই দাম কমছে না। তাই স্বল্প আয়ের অধিকাংশ মানুষের জন্য ইলিশ নিয়ে কোনো সুখবর নেই। প্রায় বছর ঘুরতে চললেও ইলিশ এবার অধরাই থেকে গেল ক্রেতাদের।
সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি জেলে ও ট্রলারের মালিকেরাও হতাশ। কারণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত দুই মাস জেলেরা সাগরে নামতে পারেননি। সাগরে মাছও ছিল না। তবে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে ১০-১২ দিন ইলিশের দেখা পেয়েছিলেন জেলেরা। এরপর কিছুদিন ইলিশ উধাও থাকলেও ২ অক্টোবর থেকে আবার তা ধরা পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই ইলিশ আর মাত্র দুই দিন ধরতে পারবেন তাঁরা।
কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাঁচ থেকে সাত দিনের একটি ট্রিপে একটি ট্রলার সাগরে নামলে খরচ হয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। কিন্তু যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ে, তা বিক্রি করে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পাওয়া যায়। লোকসান গুনতে গুনতে বহু মালিক ট্রলার বিক্রি করে দিচ্ছেন। অথচ নিষেধাজ্ঞার সময় বিদেশি জাহাজ ইলিশ ধরে নিয়ে যায়। এটা যেন না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।