পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

নিউমোনিয়াসহ তিন রোগে ৯ মাসে পৌনে ৭ লাখ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি

অসুখভেদে লিঙ্গভিত্তিক এই পার্থক্যের পেছনের কারণও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
ডেঙ্গুর সংক্রমণে রোগীর চাপ বেড়েছে হাসপাতালগুলোতে। জায়গা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। গতকাল রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণে রোগীর চাপ বেড়েছে হাসপাতালগুলোতে। জায়গা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। গতকাল রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

চলমান হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপের পাশাপাশি দেশের হাসপাতালগুলোতে মৌসুমি জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের রোগীর চাপ রয়েছে। চলতি বছর দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শুধু এই তিন ধরনের রোগ নিয়ে ভর্তি হয়েছে পৌনে ৭ লাখ মানুষ। তাঁদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ—এই দুটি রোগে পুরুষের সংখ্যা বেশি। অসুখভেদে লিঙ্গভিত্তিক এই পার্থক্যের পেছনের কারণও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


সরকারের তথ্য বলছে, হাম ও হামের উপসর্গ এবং ডেঙ্গু ছাড়া চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে ৬ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ২৭ হাজার এবং নারী ৩ লাখ ৮ হাজার।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশজুড়ে ছড়ানো বিভিন্ন ধরনের জ্বরের মধ্যে অনির্দিষ্ট বা সাধারণ জ্বরের ঘটনা বেশি। জ্বরে আক্রান্ত ৩ লাখ ৯৫ হাজার রোগীর মধ্যে আড়াই লাখই অনির্দিষ্ট জ্বরে ভুগছে। অজানা উৎসের জ্বরে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। সুনির্দিষ্ট জ্বরে ৯ হাজার এবং ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত জ্বরে ৮৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।


জ্বরের ক্ষেত্রে নারীদের আক্রান্তের হার বেশি—৫২ শতাংশ বা ২ লাখ ৬ হাজার ৪৬৪ জন। আর পুরুষ রোগী ৪৮ শতাংশ বা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৪ জন।


চিকিৎসকদের মতে, নারীদের বিশেষ হরমোন, যেমন ইস্ট্রোজেন, ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত সক্রিয় করে বলে শরীরে তীব্র প্রদাহ ও জ্বরের অনুভূতি বাড়ে। যদিও বয়সভেদে এই চিত্র বদলে যায়।


সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি জ্বরের প্রকোপ দেখা গেছে ১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে, যার সংখ্যা সাড়ে ২৮ হাজার।


চলতি বছরে দেশে নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৭৫ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২ হাজার এবং নারী রোগী ৭৩ হাজার।


বিভিন্ন ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। শ্বাসনালির বিশেষ ভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস ও প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসজনিত এবং স্ট্রেপ্টোকক্কাস ও হিমোফিলাস ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ায় নারীদের তুলনায় পুরুষ রোগী বেশি ভর্তি হয়েছে।


চলতি বছরে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ৬৪ হাজার ৭৭৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ হাজার ৭৯৭ (প্রায় ৫৫%) এবং নারী ২৮ হাজার ৯৫৮ জন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মধ্যে নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ, শ্বাসনালির তীব্র প্রদাহ বা ব্রঙ্কাইটিস এবং নাসার তীব্র প্রদাহে পুরুষ রোগী বেশি। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে টনসিলের ক্ষেত্রে। টনসিলের তীব্র প্রদাহে নারীরা বেশি ভুগছে।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের এই চিত্র স্বাভাবিক।


যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থাগার, আমেরিকান জীবাণুবিজ্ঞান সমিতি এবং বৈশ্বিক রোগব্যাধি পর্যালোচনার বিভিন্ন কারণ-নিয়ন্ত্রণ গবেষণায় দেখা গেছে, নিউমোনিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে বেশি ভোগে পুরুষ। এর পেছনে দুটি প্রধান বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা রয়েছে। জৈবিক কারণের মধ্যে পুরুষদের ফুসফুসের গড় গঠন এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জৈবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়। আর আচরণগত ও পরিবেশগত কারণের মধ্যে বাংলাদেশে পুরুষেরা জীবিকার তাগিদে বাইরের ধুলোবালি, গণপরিবহন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণজনিত বায়ুদূষণের সংস্পর্শে বেশি আসে। এ ছাড়া পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের উচ্চ হার সরাসরি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।


হাসপাতালে যাওয়া পুরুষ রোগীর উচ্চ সংখ্যা সামাজিক প্রবণতারও প্রতিফলন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁদের মতে, পুরুষের অসুস্থতায় পরিবার দ্রুত চিকিৎসা নিলেও নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগ গুরুতর হওয়ার পরই শুধু চিকিৎসা নেওয়া হয়।


২০২৪ সালে জার্মান-ব্রিটিশভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী স্প্রিংগার নেচারে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় নারী-পুরুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার ও ব্যবহারে জৈবিক এবং সামাজিক লৈঙ্গিক প্রভাব রয়েছে। এই পার্থক্য স্বাস্থ্যসেবার মান ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।


জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে পুরুষ রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এর সঙ্গে পুরুষদের বেশি মাত্রায় বায়ুদূষণ, ধুলাবালু, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি ও ধূমপানের সংস্পর্শে আসা যেমন জড়িত থাকতে পারে, তেমনি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কিছু জৈবিক পার্থক্যও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হাসপাতালে ভর্তি তথ্য দিয়ে রোগের প্রকৃত আক্রান্তের হার নির্ধারণ করা যায় না। চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে আচরণ ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও এ ধরনের পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করে।’


মহামারি, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং এ বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করা সরকারি প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটও এই লৈঙ্গিক পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের ১০টি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে বয়স, লিঙ্গ এবং রোগের ধরন অনুযায়ী সংক্রমণের প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছে।


রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণে চলতি বছর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস শনাক্তের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস একটি সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস, যা নাক, গলা ও ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে; বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণে নারী-পুরুষের সংক্রমণের ধরনেও কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।


রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা বা রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস—যে ধরনের ভাইরাসই হোক, আমরা বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তা পর্যালোচনা করি। প্রথম কারণ হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর ক্ষেত্রে আক্রান্ত বা মৃত পাখির (পোষা হাঁস, মুরগি বা বুনো পাখি) সংস্পর্শে আসার কারণ থাকতে পারে। পুরুষেরা বাইরে কাজ করে বলে তারা নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হয়—বিষয়টি শুধু এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।’


চলতি বছর ডেঙ্গু; বিশেষ করে হামের নজিরবিহীন প্রকোপে এই সময়ে হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে হাজার হাজার রোগী সামাল দিতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৮ হাজার ৩৬০ জনের বেশি। মারা গেছে ২৭১ জন।


চলতি বছর এবং বিগত বছরের ডেঙ্গু পর্যালোচনায় দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি; তবে মৃত্যু নারীদের মধ্যে বেশি। ২০২৩ সালে ভর্তি রোগীর ৬০ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ হলেও মোট মৃতের ৫৭ শতাংশ ছিল নারী।


মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের দেশব্যাপী সংক্রমণ হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত হাম এবং এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মৃত ১ হাজার ১২৮ জনের অধিকাংশই শিশু।


ঢাকা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক (চিকিৎসাবিদ্যা) ডা. আরিফুল বাসার বলেন, ‘এখন হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে একাধিক ধরনের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট একটি রোগকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। একই সময়ে বিভিন্ন সংক্রমণের রোগী সামাল দিতে হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুরোগীর চাপও রয়েছে। এই অবস্থায় রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং উপসর্গ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.