ফ্যাশনে ফিরছে গামছা, পোশাকে ও অলংকারে দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া
| মডেল: বিথী পোশাক: টাঙ্গাইল শাড়ি হাউস মেকআপ: নিউ রেড | ছবি: হাসান রাজা |
সুগন্ধি জলে স্নান সেরে
শীতল হলো বালা।
গামছা দিয়ে গা মুছিয়ে
পরালো নীল বসন।।
(পদকর্তা: রায় শেখর, রাগ: ভাটিয়ারি। শফিকুল কবীর চন্দনের ‘গামছা চরিত কথা—প্রথম পর্ব’ থেকে সংগৃহীত)
বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ। এই দিনটিকে ঘিরে থাকে কত শত পরিকল্পনা আর আয়োজন! সেই পরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে পোশাক ও সাজসজ্জা। বর্তমানে নববর্ষের ফ্যাশনে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে গামছা প্রিন্ট বা গামছা নকশার পোশাক। এটি যেন ঐতিহ্যের এক চমৎকার পুনরাবৃত্তি।
প্রায় তিনশ বছরেরও বেশি সময় আগে কবি নারায়ণ দেবের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে গামছার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট যে, গামছা এই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন একটি অনুষঙ্গ। সেই প্রাচীন অনুষঙ্গটিই এখন আমাদের নববর্ষের ফ্যাশন আইকনে পরিণত হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়।
এ জন্য বর্তমান সময়ের ফ্যাশন ডিজাইনাররা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারেন। এখন শুধু পোশাকেই নয়, গামছার সেই চিরচেনা চৌখুপি নকশা ফ্যাশনের বিভিন্ন অনুষঙ্গেও নিজস্ব মোটিফ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
নববর্ষে হরেক রঙের জমকালো পোশাক থাকলেও লাল-সাদা রঙের চিরন্তন আবেদনের কোনো বিকল্প নেই। যেহেতু এই সময় থেকেই গরমের শুরু, তাই সবাই আরামদায়ক সুতি পোশাকের দিকেই ঝুঁকে থাকেন। আরামের জন্য সুতি কাপড়ের বিকল্প নেই, আর তার মধ্যে এখন গামছা কাপড় বা গামছা প্রিন্টের শাড়ি ও পোশাক ব্যাপক জনপ্রিয়। আধুনিক কাটিং এবং ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে গামছার তৈরি পোশাকগুলো এখন অনেক বেশি সমসাময়িক ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
| মডেল: বিথী পোশাক: টাঙ্গাইল শাড়ি হাউস মেকআপ: নিউ রেড | ছবি: হাসান রাজা |
ফ্যাশনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। তারই এক অনন্য সংযোজন হলো গামছার তৈরি পোশাক। গামছা যে শুধু শরীর মোছার কাজে ব্যবহৃত হতো, সেই দিন এখন অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। বর্তমানে গামছা দিয়ে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ থেকে শুরু করে ওড়না, টপস, শার্ট, ফতুয়া ও পাঞ্জাবি—সবই তৈরি হচ্ছে। গামছার কাপড় বেশ পাতলা ও আরামদায়ক হওয়ায় তরুণ ডিজাইনারদের অনেকেই এটি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
গরম আবহাওয়ায় গামছার তৈরি পোশাক বেশ স্বস্তিদায়ক। তাই পহেলা বৈশাখের সারাদিন এই পোশাক পরে আরাম পাওয়া যাবে—এমন ভাবনা থেকেই অনেকে গামছা প্রিন্টের পোশাক বেছে নেন। দেশীয় যেকোনো উৎসবের পোশাক হিসেবে এটি সহজে মানিয়ে যায়। লাল-সাদার মিশ্রণে কিংবা যেকোনো উজ্জ্বল রঙের গামছার শাড়ি, পাঞ্জাবি বা ফতুয়া পরতে যেমন আরামদায়ক, তেমনি এটি হাল ফ্যাশনের সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
| মডেল: বিথী পোশাক: টাঙ্গাইল শাড়ি হাউস মেকআপ: নিউ রেড | ছবি: হাসান রাজা |
গামছার কাপড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর বৈচিত্র্যময় চেক মোটিফ এবং উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার। ঐতিহ্যবাহী গামছার এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রেখেই এখনকার পোশাকগুলো তৈরি করা হচ্ছে। তবে পোশাকের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গামছার কাপড়ের মান সাধারণ গামছার চেয়ে অনেক উন্নত ও মিহি। আধুনিক প্রজন্মের রুচির কথা মাথায় রেখে ডিজাইনাররা গামছার কাপড়ে নানা পরিবর্তন আনছেন। অনেকে আবার অন্য কাপড়ের সঙ্গে গামছার ফিউশন ঘটিয়ে তৈরি করছেন লেহেঙ্গা কিংবা ফতুয়া, যা বর্তমান ফ্যাশনে বেশ জনপ্রিয়।
গামছা চেকের পোশাক এখন শুধু সুতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; সিল্ক ও হাফ সিল্ক শাড়িতেও এই চেক দেখা যায়। তবে তাঁতের শাড়িতে গামছা চেকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ইদানীং গামছা কাপড়ের ব্লাউজ কিংবা শাড়ির পাড়ে গামছার প্যাচওয়ার্ক বেশ নজর কাড়ছে। এ ছাড়া কুর্তি, কটি, কাফতান, টপস ও ফতুয়াতেও গামছার ব্যবহার বেড়েছে। এসব পোশাকে ভিন্নতা আনতে কড়ি, কাঠের পুঁতি কিংবা হাতের সুতার কাজ যোগ করা হচ্ছে। নারীদের পাশাপাশি ছেলেদের জন্য গামছা কাপড়ের শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, এমনকি ব্লেজার ও কটিও তৈরি হচ্ছে। সাধারণত একরঙা পাঞ্জাবির সঙ্গে গামছার কটিগুলো এখনকার তরুণদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
| ছবি: জাদুর বাক্স |
শুধু পোশাকই নয়, গামছার নকশাকে কেন্দ্র করে এখন তৈরি হচ্ছে হরেক রকমের অলংকার। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চুড়ি, কানের দুল, নেকলেস, আংটি ও হেয়ার স্ট্রিং। গামছার কাপড়ের সঙ্গে পুঁতি, মেটাল, পাথর বা কড়ি যুক্ত করে এসব গয়নায় নতুনত্ব আনা হয়। একক পিস ছাড়াও এসব অলংকার এখন সেট হিসেবেও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
গামছার পোশাকের দাম মূলত এর ডিজাইন এবং ফ্যাশন হাউসের ওপর নির্ভর করে। ধরনভেদে এসব পোশাক ১ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। বিবিআনা, নিপুণ, যাত্রা, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির ও তাঁতিসহ দেশীয় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস গামছার ফিউশনধর্মী পোশাক তৈরি করছে।
এছাড়া 'জাদুর বাক্স'সহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজেও গামছার পোশাক পাওয়া যায়। অলংকারের দাম মানভেদে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ও অনলাইন শপ থেকে আপনি পছন্দমতো এসব গয়না সংগ্রহ করতে পারেন।
Comments
Comments