[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

অকটেনের মজুত থাকলেও সরবরাহে ঘাটতি, বিপাকে যানবাহন চালকেরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
জ্বালানি তেল নিতে দীর্ঘ সারি | ফাইল ছবি

অকটেন নিয়ে এ মাসের শুরুতেই দেশে একটি জাহাজ ভিড়েছে, আসার পথে আছে আরও একটি। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকেও উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, গত মাসের তুলনায় বাজারে অকটেনের সরবরাহ উল্টো কমেছে। এমনকি গত বছরের এপ্রিলের তুলনায়ও সরবরাহ কম দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে এবং মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তারা মূলত তিনটি বিপণন কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার ডিলারদের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে থাকে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন বিক্রি হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের মার্চে দৈনিক গড় বিক্রি ২৬ টন বেড়েছে। তবে এপ্রিল আসতেই চিত্র বদলে গেছে; গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এ বছর দৈনিক বিক্রি কমেছে ৪৯ টন। আর গত মাসের (মার্চ) তুলনায় এ মাসে দৈনিক গড় বিক্রি কমেছে ৮৩ টন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তেল নিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে মানুষের ভিড় লেগেই আছে। দিন দিন এই ভিড় আরও বাড়ছে। পেট্রলপাম্পের মালিকেরা জানিয়েছেন, মূলত অকটেন ও পেট্রল নিতেই সারা দেশে তেলের জন্য এমন দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই তেল নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মার্চের শুরুতে পেট্রল ও অকটেনের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মজুত ঠিক রাখতে সরকার প্রথমে তেল বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা বা রেশনিং চালু করে। কয়েক দিন পর সেই নিয়ম তুলে নেওয়া হলেও এখন বাজারে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে গত বছরের বিক্রির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে।

জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পেট্রলপাম্পগুলো থেকে আগের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি তেলের চাহিদা আসছে। তবে পাম্পগুলো গত বছরের ঠিক এই সময়ে যে পরিমাণ তেল নিয়েছিল, বর্তমানে তাদের সেই পরিমাণই দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক পাম্প প্রতিদিন প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না। পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলে পাম্পের এই ভিড় কমে আসতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশে যে এত বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল রয়েছে, সেটিও ছিল কল্পনার বাইরে। মূলত পেট্রল ও অকটেনের জন্যই ভিড় বেশি হচ্ছে। এ দুটির সরবরাহ বাড়ানো হলে ভোগান্তি কমতে পারে।

পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একটি অংশের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাম্প চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

গত সোমবার পেট্রলপাম্প মালিকদের সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বলেন, পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষের ভিড় কমে আসবে। গত বছরের বরাদ্দের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রয়োজনে পেট্রল ও অকটেনের দাম সমন্বয় করে সরবরাহ বাড়ানো উচিত। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এই বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে কথা বলবেন বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, জ্বালানি তেলের মজুতে কোনো সংকট নেই এবং মজুত আরও বাড়ানো হচ্ছে। তাই সরবরাহ কমার কোনো কারণ নেই, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও বলেন, আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা বন্ধ না করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।

সরকারি শোধনাগার থেকে একসময় অকটেন পাওয়া গেলেও এখন আর তা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কিনছে। এসব শোধনাগার বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত এবং আমদানি করা ঘনীভূত তরল শোধন করে জ্বালানি তেল উৎপাদন করে। এই চারটি প্রতিষ্ঠান হলো— চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড। এর বাইরে সরকারি গ্যাস কোম্পানিগুলোর নিজস্ব শোধন প্ল্যান্ট থেকেও অকটেন সংগ্রহ করে বিপিসি।

গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তিনটি তেল কোম্পানির বিপণন কেন্দ্রগুলো থেকে দিনে গড়ে ১ হাজার ২১৭ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। এই বছরের মার্চে সরবরাহ বাড়লেও এপ্রিলে তা আবার কমে গেছে। গত ১১ এপ্রিল দেশে ১ হাজার ১৪৪ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। এর পরদিন ১২ এপ্রিল তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৭৩ টনে। চলতি এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত দিনে গড়ে ১ হাজার ১৩৬ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাজারে তেলের সরবরাহ না বাড়লে জ্বালানি বিক্রয় কেন্দ্রগুলোর ভিড় কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

গত মাসে কোনো অকটেন আমদানি করা হয়নি। জ্বালানি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৯ এপ্রিল ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রামে একটি জাহাজ এসে পৌঁছায়। এ মাসে সরকারি ও বেসরকারি উৎপাদনকেন্দ্রগুলো থেকে অকটেনের সরবরাহ প্রতিদিন বাড়ছে।

গত ১২ এপ্রিল বিক্রি শেষে দেশে ২০ হাজার ১১৮ টন অকটেন মজুত ছিল, যা দিয়ে আরও ১৭ দিন চলা সম্ভব। এ ছাড়া ৩০ হাজার টন অকটেন নিয়ে আগামী ১৭ এপ্রিল আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।

বিপিসির দুজন কর্মকর্তা জানান, সাধারণত মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যাত্রীবাহী যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে অকটেন ব্যবহার করা হয়। দেশে বছরে মোট যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, তার মাত্র ৬ শতাংশ হলো অকটেন। বর্তমানে জ্বালানি বিভাগের চাপে রয়েছে তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলো। বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, যদিও বাস্তবে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। চাইলে আরও অকটেন আমদানি করা সম্ভব। তাই সরকার উদ্যোগ নিলেই অকটেনের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।

বিপিসির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। এর অর্ধেকই দেশে উৎপাদিত হয় এবং বাকি অর্ধেক আমদানি করতে হয়। চলতি এপ্রিল মাসে অকটেনের চাহিদা রয়েছে ৩৭ হাজার টন। অথচ এ মাসে আমদানি থেকে ৫৬ হাজার টন এবং দেশীয় উৎস থেকে ৩০ হাজার টন অকটেন আসার কথা রয়েছে। সেই হিসেবে অকটেনের সংকট তৈরি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

পেট্রল মূলত মোটরসাইকেলে ব্যবহার করা হয়। এ বছরের মার্চ মাসে দিনে গড়ে ১ হাজার ২৮৫ টন পেট্রল বিক্রি হয়েছে, যেখানে গত বছর এই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ সরবরাহ প্রায় ১৪ শতাংশ বা দিনে ২১১ টন কমেছে। অন্যদিকে, গত বছরের এপ্রিলে দিনে গড়ে ১ হাজার ৩৭৪ টন পেট্রল বিক্রি হলেও এবার তা ৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭১ টনে। বর্তমানে দেশে ১২ দিনের পেট্রল মজুত রয়েছে। যেহেতু ব্যবহারের সবটুকু পেট্রলই দেশে উৎপাদিত হয়, তাই এই মাসে সরবরাহে কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, বর্তমানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তেলের চাহিদা বেশি, তাই সরবরাহ কমানোর কোনো উপায় নেই। বরং এটি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। গত বছর তেল না নিলেও এবার ঢাকার সব পাম্পেই তেল সরবরাহ করা উচিত। এতে নির্দিষ্ট কিছু পাম্পে মানুষের ভিড় কমে যাবে। সেই সঙ্গে যারা তেল কিনছেন, তাদের প্রকৃত চাহিদাও যাচাই করা যেতে পারে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন