[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রিজার্ভ চুরিতে ছয় দেশের ৭০ জন চিহ্নিত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ কর্মকর্তা জড়িত

প্রকাশঃ
অ+ অ-
BB Logo

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি

১৫ মে, ২০১৫ ●

ফিলিপাইনের আরসিবিসির জুপিটার স্ট্রিট শাখায় সন্দেহভাজন চারটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ●

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়

৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ●

পাঁচটি সুইফট বার্তার মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে ডলার সরানোর বিষয়ে কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন

১৫ মার্চ, ২০১৬ ●

চুরির ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের

● ফেব্রুয়ারি ২০১৯

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আরসিবিসি ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের

● মে, ২০২০

নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নতুন করে মামলা দায়ের

● ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আরসিবিসির কাছ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার জব্দের নির্দেশ ঢাকার আদালতের

■ তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা

■ ৬ দেশের নাগরিক ও সাবেক কর্মকর্তা জড়িত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ছয় দেশের অন্তত ৭০ জনের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের মধ্যে বাংলাদেশের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ কমপক্ষে ১০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি সবাই বিদেশি নাগরিক।

এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বিদেশিদের সনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা বাংলাদেশেও একটি গোপন তদন্ত চালিয়েছে। সম্প্রতি এই সংস্থা এমএলএআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে ৪০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, এই প্রতিবেদন তাদের তদন্তকে আন্তর্জাতিকভাবে বাধা মোকাবেলায় সহায়তা করেছে। দেশের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিচারযোগ্য করতে এটির অবদান রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনাটি হলেও তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ফেডারেল রিজার্ভ থেকে গেছে, যেখানে অর্থ সংরক্ষিত ছিল। এর আগে জাপান ও ফিলিপাইনও এমএলএআর-এর মাধ্যমে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশকে দিয়েছে।

সিআইডি সূত্র জানায়, এ ঘটনায় চিহ্নিতদের মধ্যে ৪০ জন ফিলিপাইনের নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে বাকি রয়েছে উত্তর কোরিয়া, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের নাগরিক। সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হবে। গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত দুটি অভিযোগ আনা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন সিআইডি।

সিআইডি এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কবে অভিযোগপত্র দেবে। ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় ৯৩ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এই ঘটনায় মার্কিন আদালতে থাকা মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার মামলায় অভিযোগপত্র না দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

সিআইডি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তত ৩০ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের মধ্যে তিন ধরনের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা রয়েছেন; ড. আতিউরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ১০ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক. রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) কেন সরাসরি সুইফ্ট সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল, কেন ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়নি, তা নিয়েও তদন্ত হচ্ছে। যারা এই দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে।

দুই. বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য ব্যবহৃত সুইফ্ট সার্ভার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সিস্টেম। তবুও তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান কেন আরটিজিএস সিস্টেমের সঙ্গে এই সার্ভার সংযুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছিলেন, তা অপরাধমূলক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিআইডি। রিজার্ভ হ্যাক হওয়ার পর তা কিছু দিন গোপন রাখায় গভর্নরেরও দায় রয়েছে।

তিন. হ্যাকারদের পাঠানো মেলওয়্যার ইমেইল আকারে পাওয়ার পর তা যাচাই না করে যারা ডাউনলোড করেছিলেন, তারা ও অভিযুক্ত। কেউ কেউ বিষয়টি প্রকাশ হলে প্রযুক্তিগত চিহ্ন মুছে ফেলেন।

সিআইডি এই তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট, হিসাব ও বাজেট, তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ, পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডিলিংস রুমের ব্যাক অফিসের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

অর্থ হাতানোর ঘটনায় জড়িতরা কীভাবে কার সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে চারটি ক্যাসিনোর নাম দেওয়া হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে পুরো অর্থ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্যাসিনোগুলো হলো– ফিলরেম, ইস্টার্ন হওয়াই, মিডাস এবং সোলাইয়ার। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা এই ক্যাসিনোগুলোতে স্থানান্তরিত হয়।

মার্কিন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সমর্থিত সাইবার গ্রুপ লেজারাস। এই হ্যাকার গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন উত্তর কোরিয়ার নাগরিক পার্ক জিন ইউক।

সূত্রগুলো জানায়, এক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা অন্য দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানে যুক্ত থাকে। তবে এমএলএআর-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য না এলে তা আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। কয়েক বছরের অপেক্ষার পর বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন প্রতিবেদনটি পেতে সক্ষম হয়েছে। এখন এটি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আদালতে তদন্ত-দলিল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

মামলার তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদনের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করেছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রতিবেদনের কিছু প্রযুক্তিগত শব্দের ব্যাখ্যা বোঝার জন্য বাইরের বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন জানিয়েছেন, ‘মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগপত্র দাখিলের মতো অবস্থায় আমরা রয়েছি। কারা কীভাবে জড়িত তা বের করা গেছে। দেশের বাইরে পাঠানো চিঠির মাধ্যমে চাওয়া তথ্য-উপাত্ত আমরা পেয়েছি।’

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮১০ কোটি টাকা (তৎকালীন হিসাবে) চুরি হয়। সুইফ্ট পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কে অবস্থিত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও হংকং-এ এমএলএআর পাঠায়। চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও হংকং এখনও সাড়া দেয়নি।

২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের আদালতে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন ও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফিলিপাইন থেকে ১৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত এসেছে। শ্রীলঙ্কা থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত এসেছে। বাকি অর্থ এখনও আসেনি।

ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করে। মামলার তদন্ত দায়িত্ব পায় সিআইডি। গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলার তদন্ত নিতে চায়। তারা এর জন্য সিআইডিকে চিঠি দেয়, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তভার হস্তান্তরে রাজি হয়নি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মার্চে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একাধিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর, তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন পরিচালক এবং রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন কমিটিতে। কমিটিকে সচিবি সহায়তা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত অগ্রগতি, গৃহীত সরকারি পদক্ষেপ পর্যালোচনা, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে। রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে মার্কিন আদালতে চলমান মামলার রায়ের পর সিআইডির অভিযোগপত্র দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি।

পর্যালোচনা কমিটির সচিবি দায়িত্বে থাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, ‘আমাদের প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হয়েছে।’ তবে প্রতিবেদনের বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। 
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন