মেহেরপুরে ঈদের কেনাকাটার ধুম: ছুটির দিনেও ভিড় বিপণিবিতানে
![]() |
| কাপড়ের দোকানগুলোতে ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড়। শুক্রবার বিকেলে মেহেরপুর শহরের বড় বাজার এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেহেরপুর শহরের রাস্তাঘাট কিছুটা শান্ত থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। ঈদ সামনে রেখে সকাল থেকেই শহরের বড় বাজার, মল্লিকপাড়া ও হোটেল মোড় এলাকার বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিক্রেতারা। তবে পোশাকের দোকানে ভিড় থাকলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে দরজির দোকানে। সেখানে এখন নতুন কাজ নেওয়া বন্ধ বলে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শহরের বড় বাজার এলাকার শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী দোকান ‘আগারওয়াল বস্ত্রালয়’। সেখানে স্তূপ করা কাপড়ের মধ্য থেকে পছন্দের পোশাকটি খুঁজে নিতে ব্যস্ত ক্রেতারা। প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহন কুমার চৌধুরী জানান, অন্য সময় ছুটির দিনে দোকান বন্ধ থাকলেও ঈদের কেনাকাটার চাপের কারণে ক্রেতাদের সুবিধার্থে দোকান খোলা রাখা হয়েছে। এবার বাজারে পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি সিল্ক, সুতি, অরগেন্ডি ও টিস্যু কাপড়ের সালোয়ার-কামিজও ভালো বিক্রি হচ্ছে।
এবারের ঈদে মেহেরপুরের নারীদের কেনাকাটায় আভিজাত্য ও আরামের সমন্বয় লক্ষ করা যাচ্ছে। সুতি ও ভয়েল কাপড়ের নানা নকশার পাকিস্তানি ও ভারতীয় লন সেটগুলো পছন্দের তালিকায় সবার উপরে। ফ্যাশন-সচেতন তরুণীরা হালকা নীল, গোলাপি বা হালকা সবুজ রঙের আনারকলি পোশাক পছন্দ করছেন। আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি শারারা ও গারারা সেট এবং স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সিল্কের কামিজের সঙ্গে চওড়া পায়জামার চাহিদাও অনেক। এছাড়া গরমের কারণে ফুল ও লতাপাতার নকশা করা আরামদায়ক সুতি কাপড়ের চাহিদাও তুঙ্গে।
পুরুষদের ফ্যাশনেও এবার পরিবর্তন এসেছে। তরুণদের মধ্যে ঢিলেঢালা কাঁধের পাঞ্জাবি ও শার্টের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্যান্টের ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনতে অনেকেই বুটকাট প্যান্ট বেছে নিচ্ছেন। তবে অনেক ক্রেতা হাতের কাজ করা সুতি পাঞ্জাবি, পাঠান স্যুট বা হালকা নকশার শেরওয়ানি পছন্দ করছেন।
![]() |
| ক্রেতারা ঈদের কেনাকাটা করছেন। শুক্রবার বিকেলে মেহেরপুর শহরের বড় বাজার এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
শহরের দর্জি দোকানগুলোতে কারিগরদের এখন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। দিন-রাত সেলাই মেশিনের শব্দে মুখর থাকলেও অনেক দোকান এরই মধ্যে ‘অর্ডার নেওয়া বন্ধ’ লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে।
শহরের কেশবপাড়া এলাকার ‘শাপলা টেইলার্স’-এর মালিক হাসেম মিয়া জানান, কাজের চাপে তাঁরা দিশেহারা। আগে যেসব পোশাক তৈরির অর্ডার নেওয়া হয়েছে, সেগুলোই ঈদের আগে শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। তিনি বলেন, ‘আগে যেসব অর্ডার নিয়েছি, সবগুলো সময়মতো তৈরি করে দেওয়া যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
কাপড় হাতে নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন ক্রেতারা। কিন্তু কারিগরেরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন—এখন অর্ডার নিলে ঈদের আগে পোশাক দেওয়া অসম্ভব। এতে অনেকে কাপড় কিনেও তা বানাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পৌর শহরের বাসিন্দা ইরানি আক্তার জানান, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাঁচটি সালোয়ার-কামিজ পেয়েছেন। কিন্তু ভালো মানের দর্জিরা নতুন অর্ডার না নেওয়ায় এখন সেগুলো কীভাবে বানাবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুপুরের পর থেকে বাজারে ভিড় আরও বেড়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকানে পা ফেলার জায়গা নেই। দাম নিয়ে ক্রেতাদের কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও কেনাকাটায় তার প্রভাব পড়েনি। সুমি আক্তার নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘বাচ্চাদের কাপড় কেনা শেষ। এখন নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস দেখছি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার কাপড়ের দাম অনেকটা বেশি মনে হচ্ছে। আর দর্জিরা কাপড় নিতে চাইছেন না, এটাই বড় সমস্যা।’
বড় বাজারের বস্ত্রবিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এবার মেয়েশিশুদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, ওয়ান-পিস, টু-পিস ও থ্রি-পিস। এছাড়া সারারা, খাটো কামিজ ও লেহেঙ্গা ধাঁচের স্কার্টের চাহিদাও রয়েছে। আগে ফ্রক ও টিউনিকের চাহিদা বেশি থাকলেও এবার সালোয়ার-কামিজ আর ঘাগরা-চোলির দিকেই ঝোঁক বেশি। অন্যদিকে ছেলেশিশুদের পছন্দ পাঞ্জাবি-পায়জামা, কাবলি পাঞ্জাবি, গেঞ্জি ও ফতুয়া। এছাড়া আছে হাফহাতা, ফুলহাতা এবং থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট।
ভিড় সামলাতে মেহেরপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় বাজার ও হোটেল মোড় এলাকায় রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের জটলা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। মেহেরপুর জেলা দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা সজাগ রয়েছেন এবং ঈদের আগে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা হবে। সব মিলিয়ে একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন জনপদে এখন ঈদের উৎসবের আমেজ।


Comments
Comments