[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের লড়াই সুন্দরবনে

প্রকাশঃ
অ+ অ-
কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থা বিধবাদের খাদ্যসামগ্রী দেয় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

কোনো এক পবিত্র রমজান মাসে স্বামী আমীর আলী সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। সেই ঘটনার পর বহু বছর কেটে গেলেও স্বামী হারানোর সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে আছিয়া খাতুনকে। খুলনার কয়রা উপজেলার কুশোডাঙা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি আর চোখে দুঃখের ছাপ। তিনি বলেন, ‘কীভাবে যে বেঁচে আছি, তা আমিই জানি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা করে এতিম তিন মেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিয়েছি।’

রোববার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত জেলে ও বনজীবীদের স্ত্রীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সেখানে আছিয়া খাতুনসহ আরও অনেক বিধবা নারীর সঙ্গে কথা হয়।

আছিয়া খাতুন জানান, ২০০০ সালের রমজান মাসে মহাজনের অধীনে বড় একটি নৌকায় করে তাঁর স্বামী আমীর আলী ও ভাই ওমর আলীসহ ১২ জনের একটি দল গোলপাতা কাটতে সুন্দরবনে যান। টানা আট দিন কাজ করে নৌকা বোঝাই করেন তাঁরা। পরের দিন ঘন বনের মধ্যে কাজ করার সময় বাঘের থাবায় আমীর আলী মারা যান।

আছিয়া খাতুন বলেন, ‘দেখলাম স্বামীর লাশ ঘরের সামনে শোয়ানো। তারপর আর কিছু মনে নেই। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। ভোরে জানাজা শেষে কবর দেওয়া হলো। এরপর তিন মেয়েকে নিয়ে শুরু হলো আমার আরেক জীবন। মানুষের সাহায্যে মেয়েদের বড় করেছি, বিয়েও দিয়েছি।’

আছিয়া খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক বিধবা মোমেনা বেগম। তাঁর বাড়ি কয়রার মাটিয়াভাঙা গ্রামে। ২০১২ সালে রোজার ঈদের কয়েক দিন পর ভোরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে তাঁর স্বামী আতিয়ার মোল্লা নিহত হন।

মোমেনা বেগম বলেন, ‘ভাগ্য মেনে নিয়েছি। অনেক কষ্টে একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। বন বিভাগ থেকে আমাকে নৌকার একটি অনুমতিপত্র দিয়েছিল। দীর্ঘদিন নিজে সুন্দরবনে গিয়ে কাঁকড়া ধরেছি। এখন বয়স হয়েছে, আর পারি না। তাই এক জেলের কাছে অনুমতিপত্রটি ভাড়া দিয়েছি, সাত দিনে ৩০০ টাকা পাই।’

আরেক বাঘবিধবা কদবানু বিবির গল্প আরও করুণ। কয়রার চৌকুনি গ্রামের এই বাসিন্দা জানান, তাঁর স্বামী এনছার আলী মোল্লা একদল বনজীবীর সঙ্গে গোলপাতা কাটতে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে সবাই যখন নৌকায় উঠতে প্রস্তুত, তখন দলের এক তরুণ সদস্য একটি ভালো কাঠের গাছ দেখে সেটি কেটে বাড়িতে নেওয়ার কথা বলেন। তরুণটির অনুরোধ ফেলতে না পেরে এনছার আলী গাছ কাটতে থেকে যান। হঠাৎ বনের ভেতর থেকে বাঘ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি মারা যান।

কদবানু বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তান নিয়ে কষ্টের জীবন শুরু হয়। মানুষের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের বড় করেছি। কিন্তু কপাল ভালো ছিল না। স্বামী মারা যাওয়ার ১৫ বছর পর সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয় আমার বড় ছেলে। তার আর খোঁজ পাইনি। পরে আরও এক ছেলে মারা গেছে। এখন এই বুড়ো বয়সে ছোট মেয়ে রেক্সোনার সংসারে থাকি।’

টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগের (আইএফএসডি) আওতায় সুবিধাবঞ্চিত বিধবা পরিবারের মধ্যে ইফতার ও ঈদবাজার বিতরণ করা হয়। এই আয়োজনের সহযোগী ছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উপকূলীয় উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ (আইসিডি)। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক আমিরুল ইসলাম কাগজী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আইসিডির প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামানসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন