৭ মার্চের ভাষণ: মুক্তির স্বপ্নের দলিল
![]() |
| ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | ফাইল ছবি |
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন রেসকোর্স ময়দানে সভামঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সারা দেশের মানুষ কেবল নয়, পিন্ডির পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে সমরাস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত পাকসেনা কমান্ড এবং বিশ্বের পরাশক্তি ও প্রতিবেশী দেশের নীতিনির্ধারকরা সবাই ছিলেন অধীর উৎকণ্ঠা নিয়ে—কী বলবেন শেখ মুজিব। অনেকের মতামত তিনি নিয়েছেন, দলনেতা হিসেবে সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে যে ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন, সেটা যে ছিল তাঁরই ভাষণ—এটা নিয়ে কারও মধ্যে কোনো বিবাদ নেই। বিতর্ক রয়েছে ভাষণের গূঢ়ার্থ নিয়ে, এমনকি বড় অর্থ নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। তিনি কি বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন, নাকি স্বাধীনতার দুয়ার খুলে দিলেন, অথবা বন্ধ করে দিলেন? বিতর্ক তো আরও রয়েছে, কূটতর্কও রয়েছে, এমনকি সর্বজনসমক্ষে দেওয়া ভাষণ তিনি পাকিস্তানের পক্ষে জয়ধ্বনি দিয়ে শেষ করেছিলেন— এমন কথা বলবার মতো মানুষেরও দেখা মিললো ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পর। আর তাতে সায় দেওয়ার মতো গবেষকও উদিত হলো।
তবে এই ভাষণের তাৎপর্য নিয়ে দ্বিধা ছিল না যাদের মনে, তারা হলেন বাংলার মানুষ, বলা যেতে পারে সর্বস্তরের মানুষ—নগরবাসী থেকে শুরু করে গাঁও-গেরামের খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁরা বার্তা পেয়েছিলেন লড়বার, স্বপ্ন দেখতে পেয়েছিলেন স্বাধীনতার। ফলে পক্ষকালাতিক্রান্ত হতে না হতে যখন সর্বাত্মক হিংসার আক্রমণে বাঙালির টুটি চেপে রক্তপানে ঝাঁপ দিলো পাকবাহিনী তখন, এই মানুষটি তাদের সামনে না থাকলেও কর্তব্য নির্ধারণে কারও মধ্যে কোনও দ্বিধা ছিল না, যে যেখানে ছিলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে সবাই ঝাঁপ দিয়েছিল এক অসম যুদ্ধে। সমরবাস্তবতা বিচারে অসম্ভব লড়াইয়ে কীভাবে সম্ভব হয়েছিল গোটা জাতিকে একতাবদ্ধ করে মুক্তির সম্মিলিত স্বপ্নে তাদের প্রাণিত করা, সেই রহস্যের জট খোলা সহজ নয়— সেজন্য বৃহত্তর পরিসরে গভীরভাবে এর তাৎপর্য ও বহুমাত্রিকতা বিচার করা দরকার। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের বিভাজিত সমাজে নন্দিত মুজিব কিংবা নিন্দিত মুজিবের বাইরে তাঁর ভূমিকা তৎকালীন দেশীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি এবং ইতিহাসবোধ নিয়ে বিবেচনার প্রয়াস বিশেষ দেখা যায় না।
শেখ মুজিব কী বলবেন রেসকোর্স ময়দানে, এটা জানতে উদগ্রীব ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। পরে ভাষণ শুনে প্রেসিডেন্টের কাছে প্রেরিত নোটে তিনি লেখেন, “শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে (শেখ মুজিবুর) রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জন্য সামরিক আঘাত হানা কঠিন করে তুলেছে।” সামরিক আঘাত অবশ্য ইয়াহিয়া পরে করেছিলেন, মার্কিন অনুমোদন, বিশেষভাবে হেনরি কিসিঞ্জারের হাত ছিল তার পেছনে। তবে সেটা করে নৈতিকভাবে তারা পরাজিত হলেন এবং ইতিহাসের কাছে কলঙ্কিত হলেন। সাধারণভাবে যেদিকটাতে আমরা মনোযোগ দেই না তা হলো, বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত অভূতপূর্ব সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, সেটা যেমন ছিল ভাষণের, তেমনই ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
৭ মার্চের ভাষণ, তথা বাংলাদেশের লড়াই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটি বিশ্লেষণ প্রদান করেছিলেন সুদূর অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পণ্ডিত হার্বাট ফেইথ। তিনি ছিলেন মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বাংলাদেশে পাকিস্তানি বর্বরতা ও বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর দুর্দশা তাঁকে বিচলিত করেছিল। তিনি ভিক্টোরিয়ান কমিটি টু সাপোর্ট বাংলাদেশ-এর আহ্বায়ক হিসেবে ত্রাণ সংগ্রহ ও সংহতিমূলক কাজে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। অধ্যাপক হিসেবে বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস নিয়েও তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন। এর পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ফ্রিল্ডার্স ইউনিভার্সিটিতে প্রদত্ত তাঁর অ্যাকাডেমিক ভাষণে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেই দুঃসময়েও তিনি বাঙালির বিজয় সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বাংলাদেশ আন্দোলনের ইতিহাসের পরিচয়দানকালে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ঔপনিবেশিক বা কলোনিয়াল স্টেট হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের ধরন। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ কেন বায়াফ্রা বা অন্য কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন থেকে পৃথক। তাঁর বিবেচনায় বাংলাদেশ আন্দোলন দেশের মধ্যেকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এই আন্দোলন তৃতীয় দুনিয়ার পদানত অন্যান্য দেশের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী মুক্তি আন্দোলনের মতো ন্যায্যতা দাবি করে। তিনি বাঙালির মুক্তি-সংগ্রামের নিরিখে ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন যে শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনের অসাধারণ সাফল্য তাঁকে কার্যত পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকর্তায় পরিণত করেছে। এই সময়কে আমরা বলতে পারি প্রাগের বসন্তের মতো বা প্রাগ স্প্রিং (১৯৬৮ সালের তৎকালীন চেকোস্লাভাকিয়ায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাফল্য যে সুবাতাস বইয়ে এনেছিল তা’ সোভিয়েত বাহিনী পরে ট্যাংক ও গোলাবারুদ দিয়ে অস্ত্রের বলে দমন করে)। সে সময় মুক্তির আস্বাদ পাওয়া জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজে বিপুল উন্মাদনার জন্ম দেয়। তাঁর মতে, শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনও বাংলায় তেমনই বিপুল উন্মাদনার জন্ম দিয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তিনি সামান্যতে বলেছেন অসামান্য কথা, “এটা ছিল সেই সময় যখন মানসজগতে রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।”
মুক্তির স্বপ্ন-তাড়িত ৭ মার্চের ভাষণে বাস্তবের সঙ্গে কোনও বিচ্ছিন্নতা ছিল না, বরং ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নিবিড় উপলব্ধি। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে দাঁড়িয়েছেন সর্বসম্মুখে, এটা শেখ মুজিব কখনও বিস্মৃত হননি, বা বিসর্জন দেননি। তাই সংকটের শান্তিপূর্ণ সুরাহার যৌক্তিক পথও তিনি খোলা রেখেছিলেন, তাঁর উত্থাপিত চারটি দাবির প্রধান দিক ছিল—অবিলম্বে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া। এই দাবির সারমর্ম হলো, রাজপথের অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন যে পিপলস পাওয়ারের জন্ম দিয়েছে, নির্বাচনের রায়ের ভিত্তিতে তাকে অবিলম্বে শাসনতান্ত্রিক বৈধতা দেওয়া, যা বাংলায় শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিকভাবে বাঙালির শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল কমিশন জুরিস্ট ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের আন্তর্জাতিক আইনগত বৈধতা বিচার করে রিপোর্ট প্রদান করে। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৭০ সালে গৃহীত পদানত জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণার নিরিখে মত প্রকাশ করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায় নিয়ে রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রয়াস নয়, এর রয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের মান্যতা। একইসঙ্গে আইসিজে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বৈধতা স্বীকার করে নেয়। ৭ মার্চের ভাষণে দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু যে সাংবিধানিক ভিত্তিতে জনগণের প্রদত্ত রায়ের পথ থেকে কখনও সরে আসেননি, সেটা বিশেষ বিবেচনায় নেওয়ার রয়েছে।
মানুষের অন্তরে রাষ্ট্রস্বপ্ন গেঁথে দিয়েছিলেন সেই ভাষণে শেখ মুজিব। এমন ভাষণের টেক্সট ও তাৎপর্য বুঝতে তুচ্ছ তর্ক-বিতর্ক ছাপিয়ে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে খোয়াবনামা পাঠে, স্বপ্নের হাতছানি তো মানুষকে সমসময়ে ডেকে চলবে, কাল থেকে কালান্তরে। আর তাই ৭ মার্চের ভাষণ আজকের দিনেও মানুষের অন্তরে জাগায় স্বপ্নের দোলা, যে-স্বপ্নের বিনাশ নেই।

Comments
Comments