[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বগুড়ায় ঈদের সেমাই ঘিরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বগুড়ার প্রসিদ্ধ চিকন সেমাই তৈরিতে ব্যস্ত দুই নারী। গত ১৪ মার্চ বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

ঈদের দিনে সেমাই ছাড়া যেন চলেই না। আর দেশে এই সেমাইয়ের বড় একটি অংশ আসে বগুড়া থেকে। বগুড়ার লাচ্ছা ও চিকন সেমাইয়ের সুনাম দেশজুড়ে রয়েছে। এবারও বগুড়ায় উৎপাদিত সেমাই যাচ্ছে সারা দেশে। এবারের ঈদে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সেমাই বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

জেলা বেকারি মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতির সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় কারখানাগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার কেজি লাচ্ছা সেমাই তৈরি হয়। দেড় মাসে একটি কারখানায় উৎপাদন হয় ১৩৫ মেট্রিক টন। জেলায় এমন বড় কারখানা আছে প্রায় ১৫০টি। সেই হিসাবে দেড় মাসে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ২০ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। প্রতি কেজি লাচ্ছার দাম ৩০০ টাকা ধরে বড় কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সেমাইয়ের বাজারমূল্য ৬০০ কোটি টাকার বেশি।

ব্যবসায়ীরা জানান, এ ছাড়া জেলায় ছোট আরও ৮৫০টি কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৩০০ কেজি করে সেমাই তৈরি হয়। দেড় মাসে এর উৎপাদন হয় ১১ হাজার ৪৭৫ টন। প্রতি কেজি ২০০ টাকা ধরে এর বাজারমূল্য প্রায় ২৩০ কোটি টাকা। এর বাইরে চিকন ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হয় আরও অন্তত ১০০ কোটি টাকার।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, বগুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার সেমাই কারখানা রয়েছে। দুই ঈদে এসব কারখানায় তৈরি লাচ্ছা ও চিকন সেমাই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সেমাইয়ের ব্যবসা হয় বগুড়ায়।

ত্রিশের দশকে ভারতের কলকাতার নাখোদা মসজিদ এলাকার লাচ্ছা সেমাইয়ের খ্যাতি ছিল সারা ভারতবর্ষে। সেই নাখোদা এলাকা থেকে ঈদের আগে ট্রেনযোগে সেমাই পৌঁছাত বগুড়ায়।

চল্লিশের দশকে লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রসার ঘটে। কলকাতা ও হুগলি থেকে নানা রঙের লাচ্ছা এনে বগুড়ায় বিক্রি করত ক্যালকাটা বেকারি ও হুগলি বেকারি—এমন তথ্য জানান বগুড়ার প্রসিদ্ধ রাজা লাচ্ছা সেমাই কারখানার মালিক রাজা মিয়া।

রাজা মিয়া বলেন, ‘পরে কলকাতা থেকে কারিগর এনে বগুড়াতেই লাচ্ছা সেমাই তৈরি শুরু হয়। পাম তেল ও সয়াবিন তেলে ভাজা হতো সেই লাচ্ছা। পরে আকবরিয়া বেকারি ডালডা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছার প্রচলন করে। এরপর ধীরে ধীরে এখানে ছোট-বড় লাচ্ছা সেমাই কারখানা গড়ে ওঠে।’

ব্যবসায়ীরা জানান, ষাটের দশকে বগুড়ার চিকন ও লাচ্ছা সেমাইয়ের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ঈদকে কেন্দ্র করে সেমাই তৈরি হলেও এখন বছরজুড়েই উৎপাদন চলে। জেলার কাহালু উপজেলার শেখাহারে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানা থেকে ঈদ উৎসবে কয়েক হাজার টন লাচ্ছা সেমাই সরবরাহ করা হয় রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় শহরে।

আশির দশকে লাচ্ছা উৎপাদনে নাম কামায় আকবরিয়া ও এশিয়া সুইটস। এশিয়া সুইটসে দুই দশকের বেশি সময় ধরে লাচ্ছা তৈরি করছেন আবদুল কাদের। তিনি বলেন, ‘১৪ বছর বয়সে এশিয়া সুইটসের লাচ্ছা কারখানায় কাজ শুরু করি। তখন ফ্যাক্টরির প্রধান কারিগর ছিলেন ইকবাল হোসেন। তাঁর সহকারী হিসেবে আমার হাতেখড়ি হয়।’

২০০২ সালে এই কারখানায় প্রধান কারিগরের দায়িত্ব পান কাদের। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে আরও ১৫ জন কারিগর কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তারা লাচ্ছার স্বাদে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়েছেন। এখন তারা ডালডা লাচ্ছা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা তৈরি করছেন। এশিয়ায় ডালডায় ভাজা লাচ্ছার দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা, আর ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা ১ হাজার ৩০০ টাকা।

বাজার ঘুরে জানা যায়, গত বছর এশিয়া সুইটস, আকবরিয়া, শ্যামলী, কোয়ালিটি, খাজা বেকারি, ফুড ভিলেজসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডালডায় ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম ছিল ২৮০ টাকা। এবার তা বেড়ে ৩০০ টাকা হয়েছে। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম গত বছর ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা, এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর গত বছর প্রতি কেজি ভাজা চিকন সেমাইয়ের দাম ছিল ১৪০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে।

বগুড়ার সেমাই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা জানান, চল্লিশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে কয়েকজন কারিগর বগুড়া শহরতলির চারমাথা-গোদারপাড়া এলাকায় এসে চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেন। গোদারপাড়ার কারিগরদের সঙ্গে কাজ করতেন বেজোড়া এলাকার কয়েকজন। এর মধ্যে শ্যাঁওলাগাতি গ্রামের দুলু মিয়া তাঁর এলাকায় প্রথম চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেন। তাঁর হাত ধরে এই এলাকার শাহের আলী, খোকা মিয়া, জাবেদ আলীসহ অনেকেই চিকন সেমাই তৈরিতে যোগ দেন। অল্প দিনের মধ্যে বেজোড়া এলাকায় ‘চিকন সেমাইপল্লি’ হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ষাটের দশকে বগুড়ার চিকন ও লাচ্ছা সেমাইয়ের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে যায়।

বগুড়ার চিকন সেমাই কারিগরদের মধ্যে জনপ্রিয় বেজোড়া গ্রামের মাকসুদা বেগম বলেন, ‘বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শ্যাঁওলাগাতি, কালসিমাটি, শ্যামবাড়িয়া, রবিবাড়িয়াসহ আশপাশের ৮ থেকে ১০টি গ্রামের নারীদের হাতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিকন সেমাই। এই সেমাইয়ের খ্যাতি দেশজুড়ে। এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ সেমাই।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন