[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

তিন শিশুর মৃত্যু, এখন লড়ছে জান্নাতুল; রামেক হাসপাতালে আইসিইউ হাহাকার

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মার্চ মাসের ১ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত আইসিইউর অপেক্ষায় ছিল হামে আক্রান্ত ৮৪ শিশু। গতকাল রোববার রাজশাহী মেডিকেল থেকে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ছোঁয়াচে রোগ হামে আক্রান্ত শিশু জান্নাতুল মাওয়া, ফারহানা, হুমায়রা ও হিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন হলে গত বৃহস্পতিবার তাদের আইসিইউতে নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু আইসিইউ না পেয়ে শুক্রবার সকালেই মারা যায় ফারহানা ও হুমায়রা। একই রাতেই মারা যায় হিয়া। কেউই আইসিইউতে যাওয়ার সুযোগ পাননি। একমাত্র জান্নাতুল মাওয়া মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে এখনো টিকে আছে।

অবশেষে গত শনিবার বেলা তিনটার দিকে জান্নাতুল মাওয়ার জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা হয়। দ্রুত তার অবস্থা উন্নত হয়। এজন্য পরের দিন বিকেলেই তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেখানে আসার পর আবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চিকিৎসকেরা দ্রুত তাকে পুনরায় আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করেন। তবে এবার তার সিরিয়াল ছিল ৩৬ নম্বরে। আট মাস বয়সী শিশুটি আবারও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। ৩৬ নম্বর সিরিয়াল দেখে শিশুটির মা–বাবা দিশাহারা হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় সোমবার ভোররাতে শিশুটিকে খিঁচুনি নিয়ে চিকিৎসাধীন রাখা হয়।

এই চার শিশুর মধ্যে হুমায়রা ও ফারহানার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে, হিয়ার বাড়ি কুষ্টিয়ায় এবং জান্নাতুল মাওয়ার বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কোহাড় গ্রামে। তাদের বয়স ছিল পাঁচ থেকে নয় মাসের মধ্যে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি আইসিইউ বেড রয়েছে, যা সরকার অনুমোদিত নয়; হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে একটি বেডের জন্য জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা শিশুদের অপেক্ষা করতে হয়। কোনো শিশু মারা গেলে বা সামান্য সুস্থ হলে পরবর্তী রোগীর ডাক পড়ে। সিরিয়াল অনুযায়ী ৩০ থেকে ৫০ জন অপেক্ষমাণ থাকলে আইসিইউতে নেওয়া যায়। ফলে অনেক শিশু অপেক্ষায় থাকতেই মারা যায়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মার্চ মাসের ১ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত আইসিইউর অপেক্ষায় ছিল হামে আক্রান্ত ৮৪ শিশু। আইসিইউ পেলেও এর মধ্যে ৯ শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

রোববার রাতে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় দেখা যায়, একটি বেডে শিশুটিকে নিয়ে বসে আছেন তার মা উম্মে কুলসুম ও নানি ফরিদা বেগম। শিশুটির সারা শরীরে হাম উঠেছে। হাতে ক্যানুলা লাগানো আছে এবং নাকের ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। পাশে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন বাবা হৃদয় ইসলাম।

আইসিইউর অপেক্ষায় শিশুকে নিয়ে ওয়ার্ডে বসে অভিভাবক | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোজার মাঝামাঝি সময়ে জান্নাতুল মাওয়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তখন তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক সপ্তাহ পর ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার পরই শিশুটির শরীরে হাম দেখা দেয়। ২৭ রমজানে তাকে আবার হাসপাতালে আনা হলেও ঈদের সময় চিকিৎসক না পেয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়। ঈদের তৃতীয় দিনে আবার হাসপাতাল ভর্তি করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার ওয়ার্ডের চিকিৎসক তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তখন তার সিরিয়াল ছিল ২৯। তিন দিন অপেক্ষার পর শনিবার বিকেলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কিন্তু একদিন পর আবার সাধারণ ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।

শিশুটির মা উম্মে কুলসুম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়ার পর আমার বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ডাক্তার ম্যাডাম দেখেই আমাকে বললেন, আইসিইউতে কল লাগাও। এবার আইসিইউতে সিরিয়াল পড়েছে ৩৬। আমরা এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার বাচ্চা যদি সুস্থ না হয়, তাহলে আইসিইউ থেকে বের করে দেওয়া হলো কেন? সে তো আইসিইউতে ছিল, এখন তাকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হোক।’

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে প্রায় ৭০০ রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত শিশুও ছিল। গত তিন মাস ধরে সংক্রামক হাম রোগী শনাক্ত হলেও সব শিশুর সঙ্গে চিকিৎসা চলছিল। শিশুটির নানি ফরিদা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে থাকার সময়ই শরীরে মশার কামড়ের মতো দাগ দেখি। মনে হয়েছিল মশার কামড়। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পর সারা শরীরে দগদগে হাম ফুটে উঠে।’

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে প্রায় ৭০০ রোগী ভর্তি ছিল | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

শিশুটির বাবা হৃদয় ইসলাম বলেন, ‘চোখের সামনে একের পর এক বাচ্চা মারা যাচ্ছে। এসব দেখে আমরা কেমন থাকি, সেটা বলার ভাষা নেই। তিন দিন অপেক্ষার পর বাচ্চাকে আইসিইউতে নিতে পেরেছিলাম। এক দিন পরই বের করে দেওয়া হলো, আর এখন আবার সিরিয়াল পড়েছে ৩৬। হয়তো আরও চার-পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন কে দায় নেবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইটভাটায় কাজ করি। আর্থিক সামর্থ্য নেই অন্য কোনো জায়গায় বাচ্চাকে আইসিইউতে রাখার। তাই আমাদের অনুরোধ, যেহেতু আমার বাচ্চা আইসিইউ থেকে বের হয়ে অসুস্থ হয়েছে, তাই তাকে এখনই আবার আইসিইউতে নেওয়া হোক।’

আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বিষয়টি জানার পর বলেন, ‘যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল বলেই শিশুটিকে সাধারণ ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছিল। রোগী যেকোনো সময় খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাকে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আবার আইসিইউতে নিয়েছি।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন