[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ময়লার পাহাড়ে আগুন, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দুর্ভোগ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

বিরিয়ানির প্যাকেট, শিশুদের খেলনা ও চিপসের মোড়কসহ স্তূপ করা ময়লার মধ্যে পড়ে আছে দুটি কুকুরের পচা মরদেহ। চারদিকে উৎকট দুর্গন্ধ। পাহাড়সম ময়লার স্তূপ থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া, কোথাও কোথাও উঁকি দিচ্ছে আগুনের শিখা। সেই ধোঁয়ায় দম নেওয়াই কঠিন।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। কয়েক দিন আগে এখানে বড় ধরনের আগুন লেগেছিল। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরো এলাকা এখনো তাপে তেতে আছে। এই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যেই দুই শিশুকে দেখা গেল ময়লার স্তূপ থেকে সিলভারের টুকরা সংগ্রহ করতে। ল্যান্ডফিলের নোংরা পানিতে জন্ম নেওয়া কচুরিপানা ভ্যানে করে গরুর খাবারের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন কয়েকজন। পুড়তে থাকা ময়লা থেকে লোহা কুড়াতে আসা মাইশা নামের এক নারী জানান, ধোঁয়ার কারণে তাঁর চোখ ফুলে গেছে এবং তীব্র মাথাব্যথা করছে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সবচেয়ে বড় এই ল্যান্ডফিলটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ল্যান্ডফিলের বর্জ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের দাবি—তীব্র রোদ আর মিথেন গ্যাসের কারণে এই আগুন লেগেছে। কারণ যা-ই হোক, আগুন লাগার পর থেকে এলাকাবাসী আন্দোলনে নেমেছেন। ল্যান্ডফিলটি পরিবেশদূষণ ও মিথেন গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়াচ্ছে—এমন সতর্কবার্তাও বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে।

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধানত দুটি ল্যান্ডফিল রয়েছে—একটি মাতুয়াইলে এবং অন্যটি আমিনবাজারে (উত্তর সিটি)। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়, যা এই দুটি ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়।

পরিবেশগত তথ্যচিত্র

📍
১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ল্যান্ডফিলটি বর্তমানে ১৮১ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত।
💨
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৪ হাজার কেজি মিথেন নিঃসরণ হয়।
📉
এই পরিমাণ নির্গমন প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজারটি সাধারণ গাড়ি চালানোর সমান পরিবেশের ক্ষতি করে।
🔥
এখানে প্রতিবছর বারবার আগুন লাগে এবং আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

 

ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে ল্যান্ডফিলের আশপাশ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ল্যান্ডফিলটিতে আগুন লাগলেই ডাক পড়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। তবে এখানকার আগুন নেভানোকে সবচেয়ে কঠিন কাজ বলে মনে করেন তাঁরা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডেমরা স্টেশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা বড় বড় আগুন নেভানোর কাজ করি, কিন্তু এই ল্যান্ডফিলের আগুন নেভাতে কেউ রাজি হতে চান না। বিষাক্ত ধোঁয়া আর তীব্র তাপে সবাই দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ময়লার নোংরা পানি দিয়ে আগুন নেভাতে গিয়ে কর্মীদের শরীরে চুলকানিসহ নানা রোগ দেখা দেয়।’

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ল্যান্ডফিলে ভেকু মেশিন দিয়ে পুড়ে যাওয়া আবর্জনা সরানোর কাজ তদারকি করছিলেন দীন মোহাম্মদ। ১০ বছর ধরে এখানে কাজ করা এই কর্মী জানান, মাস্ক বা রুমাল ছাড়া এখানে এক মুহূর্তও টেকা যায় না। ব্যাটারি, গ্লাস, পলিথিন ও নানা রাসায়নিক বর্জ্য এখানে ফেলা হয়। আগুন লাগানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আগুন লাগলে আমাদের স্টাফদেরও কষ্ট হয়, আমরাও তো মানুষ। ল্যান্ডফিলের কাছেই আমার বাসা, আমরা কেন নিজেরা আগুন লাগাব?’

ল্যান্ডফিলের গেটের কাছেই ভাতের হোটেল চালান রোজিনা, যিনি গত ২৩ বছর ধরে এই এলাকায় বাস করছেন। হোটেলের ভেতরে অসংখ্য মাছির ভনভন আর উৎকট দুর্গন্ধের মধ্যেই তিনি জানান, আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অসুস্থ হয়ে বারবার হাসপাতালে দৌড়াতে হয়। হোটেলের পাশেই রজব আলীর ওয়েলডিং কারখানা। তিনিও জানালেন, শুধু শিশু নয়, বড়দেরও নিয়মিত জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও কাশি লেগেই থাকে।

পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা কলেজছাত্র আল মাহাদী জানান, ল্যান্ডফিল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে থাকলেও আগুনের তীব্রতা বাড়লে ধোঁয়ায় তাঁদের এলাকায় টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে।

সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ল্যান্ডফিলে আগুন লাগার ঘটনা বছরের পর বছর ধরে ঘটেই চলেছে। বিষাক্ত ধোঁয়া আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। জনগণকে নিয়ে এমন তামাশা করা সভ্য কোনো জায়গায় ঘটলে সরকার বিব্রত হতো। কিন্তু বাংলাদেশে তা তেমন আলোচনাতেই আসে না।

আদিল মুহাম্মদ খান, নগর পরিকল্পনাবিদ

 

বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সায়েন্টিফিক সেক্রেটারি ও বক্ষব্যাধিবিশেষজ্ঞ মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ঢাকার পরিবেশ এমনিতেই বিষাক্ত। ল্যান্ডফিলসহ বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য পুড়িয়ে মানুষ বাতাসকে আরও দূষিত করছে। এই দূষিত বাতাস ফুসফুসে ঢুকলে হাঁচি-কাশিসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের ‘বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৪’ অনুযায়ী, বায়ুদূষণে ২০২৪ সালে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। আর শহর হিসেবে ঢাকা ছিল তৃতীয় শীর্ষে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ অনুযায়ী, খোলা অবস্থায় বর্জ্য সংরক্ষণ বা পোড়ানো নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করলে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

১৯৮৯ সালে মাত্র ২৫ একর জায়গায় শুরু হওয়া মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলটি বর্তমানে ১৮১ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে ১০০ একর জায়গা ইতিমধ্যে ময়লায় ভরাট হয়ে গেছে। নতুন অধিগ্রহণ করা ৮১ একরের মধ্যেও ৫ একর ভরাট হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাকি জমির মধ্যে ৩০ একরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। অবশিষ্ট ৪৫ একর জায়গায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ বছর ময়লা ফেলা সম্ভব হবে। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য ফেলা হয়।

ল্যান্ডফিলটিতে মিথেন গ্যাসের উচ্চ উপস্থিতি এখন উদ্বেগের বড় কারণ। ২০২১ সালে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান জিএইচজিস্যাটের বরাতে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই ল্যান্ডফিলটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪ হাজার কেজি মিথেন নিঃসরণ করছে। বর্তমানে এটি একটি ‘বিপজ্জনক হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ গ্যাস নির্গমন প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সাধারণ গাড়ি চালানোর সমান পরিবেশের ক্ষতি করছে।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

২০০৩ সালে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের উন্নয়নে যুক্ত হয়। ২০২১ সালে বর্জ্যের ভাগাড়ে উৎপন্ন গ্যাসের পরিমাপ ও দূষিত তরল (লিচেট) পরীক্ষার জন্য জাইকা ড্রোন, গ্যাস অ্যানালাইজারসহ উন্নত যন্ত্রপাতি হস্তান্তর করে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দক্ষ জনবল ও বাজেটের অভাবে এসব যন্ত্রের নিয়মিত ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি লিচেট পরিশোধন প্ল্যান্টটিও কার্যকর করা যায়নি।

২০০৫ সালে ‘ক্লিন ঢাকা’ এবং পরবর্তীতে ‘নিউ ক্লিন ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান ২০১৮-২০৩২’ গ্রহণ করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বর্জ্যহীন শহর নিশ্চিত করা। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ৩৭ বছরের পুরোনো এই ল্যান্ডফিলের বিভিন্ন পকেটে মিথেন গ্যাস জমা হয়ে আগুন লাগছে। প্রতিদিন ময়লা ফেলার পর তা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বাজেট ও জনবল স্বল্পতার পাশাপাশি সরকারের সদিচ্ছার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণা (২০২১) অনুযায়ী, মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল জনবসতি ও কৃষিভূমির খুব কাছে হওয়ায় স্থানীয়রা শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও পেটের সমস্যায় ভুগছেন। ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত তরল ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটিকে দূষিত করছে, যা মৎস্য চাষ ও কৃষিকাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক জানান, ল্যান্ডফিলের আগুন থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১ মার্চ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার এ বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছিল।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ল্যান্ডফিলে আগুন লাগার ঘটনা বছরের পর বছর ধরে চলছে। বিষাক্ত ধোঁয়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। জনগণকে নিয়ে এমন উদাসীনতা কোনো সভ্য দেশে ঘটলে সরকার বিব্রত হতো, কিন্তু বাংলাদেশে এটি তেমন আলোচনাতেই আসে না।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন