[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রাজশাহীতে জামায়াতের ইফতার মঞ্চে তালিকাভুক্ত ‘মাদক কারবারি’, সমালোচনা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন জামায়াতের ইফতার মাহফিলের মঞ্চে যুবলীগ নেতা ও সরকারের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। সোমবার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে | ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ‘রাজশাহীর প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের’ তালিকায় ছিল যুবলীগ নেতা সেতাবুর রহমানের (বাবু) নাম। তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ছিলেন। হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় তাঁকে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর নামে হত্যাসহ আরও মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। হঠাৎ সোমবার তাঁকে গোদাগাড়ীর একটি ইফতার মাহফিলের মঞ্চে দেখা গেছে।

উপজেলার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে ইউনিয়ন জামায়াত। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। মঞ্চে তাঁর পেছনের সারিতে বসে ছিলেন সেতাবুর রহমান।

সেতাবুর রহমানের বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার রেলগেট এলাকায়। তাঁর বাবার নাম আতাউর রহমান। ২০১৭ সালের তালিকায় সেতাবুরের বয়স লেখা ছিল ২৭ বছর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই তালিকায় সেতাবুরের বাবার পরিচয় লেখা ছিল দিনমজুর হিসেবে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেতাবুর আগে পাওয়ার টিলারের চালক হিসেবে কাজ করতেন। মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন। পরে মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ইউপি সদস্য থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে করা প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় ৯ নম্বরে তাঁর নাম ছিল।

একই তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এক নম্বরে নাম ছিল রাজশাহী-১ আসনের তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর। এই নিয়ে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি একটি সংবাদপত্রে ‘মাদকের পৃষ্ঠপোষকতায় সাংসদের নাম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনশ্রুতি রয়েছে যে, মাদক ব্যবসায়ীরা গোপনে ও পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ অন্যান্য দলের কিছু অসাধু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে।

মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাব্বির রহমান বলেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান। এ কারণে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ওই সময় জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানান। এরপর তাঁকে ইউপি সদস্যের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তখন থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।

সেতাবুরের বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা আছে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে তিনি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি হয়েছিলেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে তাঁর নেতৃত্বেই। সেদিনের ওই হামলায় এলাকার বাসিন্দা জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলামের বাবা নজরুল ইসলাম মারা যান। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর নিহত নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে সেতাবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের কার্যালয়ও দখল করেছিলেন তিনি। ওই ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর আরও একটি মামলা হয়েছে। সেই মামলায় ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও গিয়েছিলেন।

ইফতার মাহফিলের প্রধান অতিথি জামায়াতের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের কাছাকাছি বসে আছেন যুবলীগ নেতা ও সরকারের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। সোমবার জেলার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে | ছবি: সংগৃহীত

জামায়াতের ইফতার মঞ্চে তাঁকে দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুনছি যে জামায়াতের এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের পুরো টাকাটাই দিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ী সেতাবুর রহমান বাবু। তা না হলে তাঁকে মঞ্চে বসতে দেবে কেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাঁকেই এখন দেখা যাচ্ছে জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে সংসদ সদস্যের পাশে। এটা খুব দুঃখজনক। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন, আর এলাকায় এসে আওয়ামী লীগ ও মাদক ব্যবসায়ী পুনর্বাসন করছেন। এলাকার মানুষ হিসেবে আমাদের এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না।’

এ ব্যাপারে মঙ্গলবার বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও এলাকার সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

গোদাগাড়ী উপজেলা জামায়াতের আমির নুমাউল আলী দাবি করেন, তিনি প্রথম সারিতে থাকায় পেছনে দেখতে পাননি। তিনি বলেন, মাদকের ব্যাপারে তাঁদের নীতি অত্যন্ত কঠোর (জিরো টলারেন্স)। সাধারণ মানুষ হিসেবে সেতাবুর মঞ্চে উঠতে পারেন। সাধারণ মানুষ কি জামায়াতের মঞ্চের চেয়ারে বসতে পারেন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি নেতা-কর্মীদের কাছে খোঁজ নিয়ে পরে বিষয়টি জানাতে পারবেন যে কীভাবে তিনি মঞ্চে উঠলেন।

সেতাবুরের টাকায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজনের অভিযোগ প্রসঙ্গে নুমাউল আলী বলেন, তার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁরা বরাবরের মতো যেভাবে আয়োজন করেন, সেভাবেই করেছেন।

কথা বলার জন্য সেতাবুর রহমানের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান বশির বলেন, মাদক ব্যবসায়ী হলে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেও ছাড় পাবে না। তাঁর নামে কোনো মামলা কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না, তা দেখে বলতে পারবেন।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন