জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ফারুকীর অনিয়মের কীর্তি
| মোস্তফা সরয়ার ফারুকী | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং দলিল সংরক্ষণের জন্য নেওয়া ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রকল্প নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বার্থের সংঘাতের প্রমাণ মিলেছে সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে।
একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক উপদেষ্টা নিজেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে নিজের নিয়োগকর্তা ও জাদুঘরের প্রধান পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এই পদে যোগদানের জন্য শিক্ষাগত যে ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত থাকে, তা ওই কর্মকর্তার সুবিধামতো শিথিল করা হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল জাদুঘরটি জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে পরিচালিত হবে। তবে অভিযোগ আছে, ওই কর্মকর্তার প্রভাবেই এটিকে আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৯৬ কোটি টাকার বাজেটের এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হবেন ইতিহাস, শিক্ষা বা সংস্কৃতির কোনো বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সভাপতির পদ নির্বাচন হওয়ার কয়েক দিন আগে ওই কর্মকর্তা নিজেই পদটি গ্রহণ করেন।
নিয়োগ বিধিমালার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত ১০৭টি পদের কাঠামো গ্রহণ না করে, একজন জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়। এতে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের শর্ত থাকলে ওই কর্মকর্তার পক্ষে সভাপতি হওয়া সম্ভব হতো না।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার জন্য কমপক্ষে ২১ দিন সময় দিতে হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭ দিন। বিজ্ঞপ্তিতে ‘জুলাইয়ের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করা’ বা ‘নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিশ্বাসী’ মতো অস্পষ্ট ও আবেগপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সরকারি নিয়মের সঙ্গে মানানসই নয়।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও ত্রুটি দেখা গেছে। লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও সময়ের অভাবে কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হয়। একজন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ জানান, সরকারি চাকরিতে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।
প্রকল্পের ব্যয়ের স্বচ্ছতাও প্রশ্নের মুখে। জাদুঘরের জন্য ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ একটি বেসরকারি সংস্থাকে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকায় দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই সংস্থার কোনো অভিজ্ঞতা নেই এবং মালিকের সঙ্গে কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারে। এর কারণে বিশ্লেষকরা দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
৯৬টি পদের বিপরীতে ১৩ হাজার আবেদন জমা পড়লেও সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২০০ জনকে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসার জন্য যে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটি ফারুকী সাহেবের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এটি প্রশাসনের জন্য একটি খারাপ উদাহরণ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১০৭টি পদের একটি পেশাদার খসড়া প্রস্তাব করেছিল, যা ফারুকী গ্রহণ করেননি। পরে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগ্যতার শর্ত কমিয়ে নতুন কাঠামো করা হয়। পুরনো শর্ত থাকলে তিনি নিজেই সভাপতি হতে পারতেন না।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক বলেন, মন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো উপদেষ্টা যদি একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ নেন, তবে তা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। ব্যক্তিগত যোগ্যতা থাকলেও নিজের সুবিধামতো যোগ্যতার মান ঠিক করা ঠিক নয়।
Comments
Comments