আসিফ নজরুলের সময়ে শতকোটির বদলি বাণিজ্য, নেপথ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ৮ মাস
| আসিফ নজরুল | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
অন্তর্বর্তী সরকারের গত আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ঘিরেই প্রায় শতকোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময়ে এসব বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়ম বা নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ঘুষের প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও মিলেছে। কোনো কোনো কর্মকর্তাকে মাত্র ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে অন্তত ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০০ জন বড় অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের কার্যালয়ে পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, একেকজন ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে সুবিধাজনক স্থানে বদলি হয়েছেন। অতীতে কখনো এত অল্প সময়ে এত বেশিসংখ্যক বদলির নজির নেই।
বদলির নিয়ম অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদমর্যাদা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আট মাসে সেই নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী, ‘ক’ শ্রেণির সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘ক’ শ্রেণির অফিসে এবং ‘গ’ শ্রেণির কর্মকর্তাকে ‘গ’ শ্রেণির অফিসে বদলি করতে হয়। কিন্তু ওই সময়ে ঘুষের বিনিময়ে অনেক ‘গ’ ও ‘খ’ শ্রেণির সাব-রেজিস্ট্রারকে উচ্চতর শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় ‘ক’ শ্রেণির সাব-রেজিস্ট্রারদের ‘শাস্তি’ হিসেবে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণির অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আক্রান্ত কর্মকর্তাদের অনেককেই বারবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগের দিনই আবার অন্য অফিসে বদলির চিঠি দেওয়া হয়েছে। বদলি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, গত বছরের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা জারি করে।
সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বা পদায়নে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। কোনো অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রলোভন বা প্রতারণা থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই শত শত সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়ে যায়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর অবশ্য নতুন করে আর কোনো বদলির আদেশ হয়নি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘুষ-বাণিজ্য’ হয়ে আসছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে অন্তত সরকারি ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রতি কিছুটা হলেও সম্মান দেখানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ওই আট মাসে ‘ঘুষ-বাণিজ্যে’ কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন বা আইন প্রয়োগকারী যেকোনো কর্তৃপক্ষ শুধু নীতিমালা ভঙ্গের বিষয়টি অনুসন্ধান করলেই ‘ঘুষ-বাণিজ্যের’ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাবে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, ‘পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বা অন্য যেকোনোভাবে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এলে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা বা অন্য যেই হোক না কেন, কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিক জেলা রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি ও বদলির আদেশ দেন। তবে সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রথম বদলির আদেশ দেন সে বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই আদেশে মোট ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ‘সি’ গ্রেডের কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের কার্যালয়ে বদলি করে অধিদপ্তরের নীতিমালা ভঙ্গ করা হয়।
ওই আদেশে (২৯ সেপ্টেম্বর) সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে বদলি করা হয়। এর চার মাস পর ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মনীষাকে হরিপুর থেকে বদলি করা হয় দিনাজপুরের হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে হাকিমপুরে যোগদানের আগের দিন মনীষাকে আবার বদলি করা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে।
একইভাবে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হয়। তবে ‘তদবিরের মাধ্যমে’ মাত্র দুই দিনের মধ্যে রেহানা ১১ এপ্রিল বদলি নিয়ে বরিশালের মুলাদী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে যোগ দেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে সাব-রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্য্যকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় থেকে বদলি করা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তিনিও দুই দিন পরই বদলি নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চলে আসেন।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আব্দুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলি করা হয়। যোগদানের আগের দিন ৬ অক্টোবর এই বদলি স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে অন্তত ১৬টি আদেশ জারি হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে ৮৭ জনকে বদলি করা হয়। আর ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আদেশে ১৯৫ জনকে বদলি করা হয়।
আদেশগুলো হলো—২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ১০ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭ জন, একই বছরের ৭ অক্টোবর ৫ জন, ১ ডিসেম্বর ৩৮ জন এবং ১৯ ডিসেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জানুয়ারি ৫ জন, ১৫ জানুয়ারি ১২ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৭ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৬ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৭ মার্চ ২৬ জন, ৯ এপ্রিল ৩৬ জন, ১০ এপ্রিল ৪ জন এবং ২৭ এপ্রিল ৪৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়।
এর মধ্যে অন্তত ২০০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে তৎকালীন আইন সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নিবন্ধন বিভাগের সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোর নির্ধারিত শ্রেণিবিন্যাস (এ, বি, সি) প্রযোজ্য হবে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া বা সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের ‘সি’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা হবে। বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি স্থায়ী হলে ‘সি’ শ্রেণির কার্যালয়ে পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরি, জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সুযোগ থাকলে তাদের ‘বি’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে। একইভাবে ‘বি’ শ্রেণির কার্যালয়ে পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর সুযোগ থাকলে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ‘এ’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে।
কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের কাজ সন্তোষজনক না হলে কর্তৃপক্ষ তাকে গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের জন্য অযোগ্য বিবেচনা করে জনস্বার্থে নিম্ন শ্রেণির কার্যালয়ে বদলি করতে পারবে। তবে এমন ক্ষেত্রে তার অসন্তোষজনক কাজের যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করতে হবে।
সাব-রেজিস্ট্রাররা সাধারণত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির কার্যালয়ে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। তবে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে এই মেয়াদের আগেও তাদের বদলি করতে পারবে।
কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদে কাজ করলে পরে ছয় বছরের মধ্যে তাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরের কোনো কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। আবার কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বা সিলেট মহানগর এলাকায় পদায়ন পেয়ে কাজ করলে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাকে এসব মহানগরের কোনো কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না।
কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার ঢাকা বা চট্টগ্রাম জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদে কাজ করলে পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে তাকে ঢাকা বা চট্টগ্রাম জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। আবার কোনো সাব-রেজিস্ট্রার একবার গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়ন পেয়ে কাজ করলে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাকে ওই দুই জেলার কোনো সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না।
কোনো সাব-রেজিস্ট্রার কোনো কার্যালয়ে একবার পদায়ন পেয়ে যেকোনো মেয়াদে কাজ করলে দ্বিতীয়বার তাকে ওই কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না।
পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় অবসরের কাছাকাছি সময় (ছয় মাসের আগে নয়) থাকা কোনো সাব-রেজিস্ট্রার তার আবেদনের ভিত্তিতে নিজ জেলা বা পাশের জেলার কোনো কার্যালয়ে পদায়ন পেতে পারেন।
এ ছাড়া কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থল বা তার কাছাকাছি স্থানে বদলির বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত বিধানগুলো শিথিল করতে পারবে।
কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার জানান, বিদ্যমান এই নীতিমালা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপেক্ষা করা হয়েছে।
Comments
Comments