[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

এক বছরে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ২৭ শতাংশ

প্রকাশঃ
অ+ অ-

২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে

ধর্ষণের মামলা

২০২৪
৫,৫৬৬
২০২৫
৭,০৬৮

সূত্র : সুপ্রিম কোর্ট ও পুলিশ সদর দপ্তর

নির্যাতন বিরোধী গ্রাফিক্স

 মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ বুঝতে চাইলে আদালত আর হাসপাতালে আসুন—কথাটি বেশ প্রচলিত। তবে এটিই পরম সত্য। ১ মার্চ ঢাকার চারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঘোরার সময় অপরিচিত মুখগুলোতে দুঃখ ও উদ্বেগের ছাপ খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠতে দেখা যাচ্ছিল।

আদালতের কক্ষের ভেতরে জায়গা কম থাকায় ভুক্তভোগী নারী ও তাঁদের স্বজনেরা বাইরের বারান্দার বেঞ্চে বসে ছিলেন। মামলার নম্বর আর নাম ধরে ডাক পড়তেই নারীরা উদ্বেগ নিয়ে বিচারকের সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন। একটি ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন ব্যবহার করায় ভুক্তভোগী নারীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা বাইরে থেকে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪–এর পেছনের বেঞ্চে এই প্রতিবেদকের পাশে বসে ডাক পাওয়ার আশায় ছিলেন এক তরুণী। এই ট্রাইব্যুনালে কোনো মাইক্রোফোন নেই, তাই মামলার বাদীদের দুঃখভরা ও ক্লান্ত কণ্ঠস্বর বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল না। সেখানে শুধু বিচারক ও আইনজীবীর কথা শোনা যাচ্ছিল।

বোঝা যাচ্ছিল, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক শিশুর মামলায় এক আসামির জামিনের আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু বিচারক তা নাকচ করে দিয়েছেন। শিশু ধর্ষণ মামলার আসামির দিকে তাকিয়ে বিচারক তিরস্কার করলেন। সেদিকে তাকিয়ে ওই তরুণী পাশে বসে থাকা এই প্রতিবেদককে বললেন, তিনি প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের মামলার আবেদন নিয়ে এসেছেন। তিনি প্রচণ্ড মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কথা বলার এক পর্যায়ে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন তিনি।

ঢাকার এই আদালতগুলোতে যখন ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে আবেদন গ্রহণ ও শুনানি চলছে, তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। পাবনায় দাদিকে হত্যা করে কিশোরী নাতনিকে ফসলের খেতে টেনে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের পরিবার স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়েছিল; কিন্তু মেয়েটি পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুকে যৌন নির্যাতনের পর গলা কেটে দেওয়া হয়। রক্তাক্ত শিশুটি জঙ্গল থেকে একা হেঁটে বের হয়ে এসেছিল, যা দেখে অনেকে শিউরে ওঠেন। দেড় দিন লড়াইয়ের পর হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তাঁর সাবেক প্রেমিকের হাতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণপিটুনির ঘটনার ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই তরুণীকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন আরেক শিক্ষার্থী। এরপর আরও ঘটনা ঘটেছে। ৩ মার্চ সাহরি খেতে ওঠার সময় কক্সবাজারের উখিয়ায় বাড়িতে ঢুকে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এসব ঘটনার কোনোটিতে মামলা হয়েছে, আবার কোনোটিতে হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, তার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই ধর্ষণের অভিযোগ।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই প্রত্যাশার স্লোগান নিয়ে আজ রোববার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এটি সবার দায়িত্ব। এটি মোকাবিলায় সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নারীর মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। নারীকে মর্যাদার আসনে বসাতে শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো—ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক, যৌন হয়রানি, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি এবং দহনকারী পদার্থ (যেমন এসিড) দিয়ে করা অপরাধ।

২০২৫ সালের মামলাগুলোর মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টিই ছিল ধর্ষণের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ১৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও ১ হাজার ৮৯৭টি শিশু। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে মামলা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। এর আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি এবং ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল।

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১১ হাজার ৫৬৭টি। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯১টি মামলা ৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানি যেন প্রতিদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের একটি রূপ হলো এই সহিংসতা। পুরুষদের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, নারীর ওপর সহিংসতা করা তাদের অধিকার এবং তারা পার পেয়ে যাবে।’

নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে শিরীন পারভীন বলেন, এই আন্দোলনের মূল কথা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন এবং সম্মান করুন। সরকারকে নারীর ওপর সহিংসতাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে গণ্য করতে হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় যেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এক্ষেত্রেও তেমন উদ্যোগ নিতে হবে।

গত বছরের মার্চে মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর ধর্ষণের মামলার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এনে ওই বছরের ২৫ মার্চ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। নতুন আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণকে মূল ধর্ষণের ধারা (৯)-এ রাখা হলেও একে আলাদা একটি উপধারায় (৯খ) ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের দণ্ড’ শিরোনামে যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, আদালত যদি মনে করেন ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসকের সনদ দিয়ে বিচার চালানো সম্ভব, তবে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। বিয়ের প্রলোভনের ধারাটি বাদে অন্য সব ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। এখন তদন্ত হবে ১৫ দিনে এবং বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক প্রয়োজন মনে করলে এই সময় বাড়াতে পারবেন। আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।

২০০০ সালে তৈরি হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত পাঁচ বছরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার পরিবর্তন আনা হলো। এর আগে ২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন সরকার এই আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করেছিল। পাশাপাশি তখন আসামি শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘নারীর ওপর সহিংসতা চলতে থাকার পেছনে নারী আন্দোলনেরও কিছু ব্যর্থতা আছে। আমরা অনেক অর্জন ধরে রাখতে পারি না। ২০২০ সালে বেগমগঞ্জে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় বিভিন্ন প্রজন্মের নারীরা এক হয়ে বড় বিক্ষোভ করেছিলেন। সেই প্রতিবাদ ধরে রাখতে পারলে হয়তো কিছু পরিবর্তন আসত। তবে নারী আন্দোলনের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন তা নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু যিনি ভুক্তভোগী, তাঁর পাশে থাকা বা মামলার বিচার ও তদন্ত ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা হয় না। আবার অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে এবং উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই দোষারোপ করা হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে জানিয়েছে, ধর্ষণের ৪৪ শতাংশ অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে থানা ও আদালতে এসব মামলা করা হয়েছিল। পিবিআই এই প্রতিবেদনটি গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ করে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তার অন্তত ৩০ শতাংশ আসলে সত্য ছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব, বাদীর অনাগ্রহ আর তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতার কারণে তদন্তে সেগুলো প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। 

শুধু বিচারপ্রক্রিয়া তদারকি না করে তদন্তের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া দরকার বলে মনে করেন আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হচ্ছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অনেক সময় মামলায় পুলিশ ও চিকিৎসকের মতো পেশাদার সাক্ষীরা উপস্থিত হন না। অনেকে অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যান। তাঁদের আসা-যাওয়ার কোনো খরচও দেওয়া হয় না। এই বিষয়গুলো সমন্বয় করা দরকার। সেই সঙ্গে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সারা হোসেন নারী নির্যাতনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। তাঁর মতে, মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা প্রয়োজন। ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলগুলোকে সরকারি অর্থায়নে বড় পরিসরে পরিচালনার জন্য কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া দরকার।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন