পেকুয়ায় মা-মেয়েকে থানায় ডেকে মারধর, পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে কারাদণ্ড
![]() |
| আদালত | প্রতীকী ছবি |
কক্সবাজারের পেকুয়ায় দুই নারীকে থানায় ডেকে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁদের এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘটনাটি জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে পুলিশের দাবি, মারধরের অভিযোগ মিথ্যা; বরং ওই নারীরাই পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছেন।
কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই নারী হলেন রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁদের সাজা দেওয়ার পর বুধবার সন্ধ্যায় তাঁদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
স্বজন ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জুবাইদা বেগম ২০২৪ সালে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পেকুয়া থানাকে নির্দেশ দেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ। তিনি গত ডিসেম্বরে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
মামলার বাদী জুবাইদা বেগমের খালা আমেনা বেগম অভিযোগ করেন, মামলার প্রতিবেদন পক্ষে দিতে এসআই পল্লব বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলেন। স্বর্ণ বন্ধক রেখে তাঁকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও তিনি বিপক্ষে প্রতিবেদন দেন। এ নিয়ে এসআইয়ের সঙ্গে মা-মেয়ের একাধিকবার কথা-কাটাকাটি হয়।
আমেনা বেগম আরও বলেন, ‘এরই জের ধরে বুধবার বিকেলে তাঁদের থানায় ডেকে নেন এসআই পল্লব। সেখানে টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে দুজনকে একটি কক্ষে আটকে রেখে ব্যাপক মারধর করা হয়। পরে ইউএনও-কে থানায় ডেকে এনে তড়িঘড়ি করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’ গতকাল কারাগারে মা-মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, রেহেনার মুখ, চোখ ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন রয়েছে। জুবাইদাও গুরুতর আহত।
দুই নারীকে মারধর ও কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করে। ভিডিওতে ওই দুই নারীকে পুলিশের সঙ্গে উচ্চবাচ্য ও আক্রমণাত্মক আচরণ করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তাঁরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা তাঁদের ধরে এনে থানা ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে বসান।
ঘটনা প্রসঙ্গে এসআই পল্লব কুমার ঘোষ বলেন, ‘ওই দুই নারী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁরা থানায় ঢুকেই আমাকে এবং পরে ওসি স্যারকেও গালিগালাজ শুরু করেন। নারী কনস্টেবলরা তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করলে তাঁরা পুলিশ সদস্যদেরও মারধর করেন।’ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, ওই নারীরা নিজেরাই থানার দেয়ালে আঘাত পাওয়ায় আহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম বলেন, ‘ওই নারীরা সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে হাতাহাতি করেছেন। খবর পেয়ে আমি থানায় গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে তাঁদের এক মাস করে সাজা দিয়েছি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর আগেও ওই নারীরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এসি ল্যান্ডের সঙ্গে অসদাচরণ করেছিলেন।
তবে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে জুবাইদা বেগমের করা মামলার আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন পুলিশের এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁরা খারাপ আচরণ বা হামলা করলে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে মামলা দিতে পারত এবং আদালতে পাঠাতে পারত। কিন্তু থানার ভেতরে তাঁদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করা এবং পরে ইউএনও-কে ডেকে এনে সাজা দেওয়া কতটা আইনসম্মত, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

Comments
Comments