[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

হঠাৎ সয়াবিন তেল সরবরাহে সংকট, খোলা তেলের দাম বেড়েছে

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সয়াবিন তেল | ফাইল ছবি

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান গতকাল শনিবার সকালে বাসা থেকে বের হন এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে। প্রথমে মহল্লার তিনটি মুদিদোকানে খোঁজ করেও তেল পাননি। এরপর শেওড়াপাড়া বাজারে গিয়ে চারটি দোকান ঘোরার পর ৫ লিটারের একটি বোতলজাত সয়াবিন তেল কেনেন।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার দরকার ছিল ২ লিটারের এক বোতল। কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শেষে কয়েক দোকান ঘুরে বাধ্য হয়ে ৫ লিটারের বোতল কিনেছি। হঠাৎ তেলের এমন সংকট কেন হলো, বুঝলাম না।’

শুধু শেওড়াপাড়া নয়, রাজধানীর অনেক জায়গাতেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা পর্যায়ে এখনো বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়েনি, কিন্তু ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বাড়তি।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মাসখানেক ধরেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। গত তিন-চার দিনে এই সংকট আরও বেড়েছে। একদিকে তেল কোম্পানিগুলো বাজারজাত করা কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত হয়ে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন। সব মিলিয়ে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন যা দেখা গেল, গতকাল সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বেশির ভাগ মুদিদোকানে ৫ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও তার পরিমাণ ছিল খুব কম। আর ১ ও ২ লিটারের বোতল হাতে গোনা দু-তিনটি দোকানে পাওয়া গেছে। পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বাইরে অন্য কোনো ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল খুব একটা দেখা যায়নি।

কৃষি মার্কেটের মুদিদোকান খোকন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তেলের অবস্থা খুব খারাপ। দু-তিন দিন আগেও ডিলারের কাছ থেকে মোটামুটি তেল পাওয়া যেত। এখন বোতলের সয়াবিন নেই বললেই চলে।’

হুমায়ুন জানান, স্বাভাবিক সময়ে তিনি ডিলারের কাছ থেকে দিনে ৮–১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে মাত্র দু-তিন কার্টন তেল আনতে পারছেন। তা–ও আবার আগের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে।

শেওড়াপাড়া বাজারের বিক্রেতা আবদুল হাকিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অনেক ক্রেতা মনে করছেন কয়েক দিনের মধ্যে তেলের সংকট হতে পারে। এই ভয়ে যাঁর এক বোতল লাগত, তিনি দুই বোতল কিনছেন। সামনে ঈদ থাকায় বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজারে সয়াবিন তেলের তিনটি ব্র্যান্ডের ডিলারের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা সেখানে ভিড় করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ বিক্রেতাই চাহিদামতো তেল কিনতে পারছেন না।

মগবাজার এলাকার বিক্রেতা মো. পলাশ একটি ডিলারের দোকানে তেল নিতে এসে বলেন, ‘আমার ৫ ও ২ লিটারের চার কার্টন করে তেল লাগত। কিন্তু ডিলার আমাকে মাত্র এক কার্টন করে তেল দিয়েছে। বলেছে, আজ (রোববার) আবার দেবে। রিকশা ভাড়া করে এত কম তেল নিয়ে তো পোষাবে না, কিন্তু এছাড়া কোনো উপায়ও নেই।’

গত বছরের ৭ ডিসেম্বরে সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ৬ টাকা বাড়ানো হলে ১ লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হয় ১৯৫ টাকা এবং ৫ লিটারের দাম হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর খুচরা দাম বাড়ায়নি। তবে সম্প্রতি ডিলার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যে দামে তেল কেনেন, সেটি বেড়েছে। এতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমে গেছে।

বিক্রেতারা জানান, ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে তাঁরা এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতেন এবং ৯৪০ টাকায় বিক্রি করতেন। এতে ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু তিন-চার দিন ধরে তাঁরা ৫ লিটারের বোতল কিনছেন ৯৫০ টাকায় এবং বিক্রি করছেন ৯৫৫ টাকায়। অর্থাৎ ডিলার পর্যায়ে দাম ১০ টাকা বেড়েছে। এতে খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ৫ টাকা কমে গেছে। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদেরও আগের চেয়ে ৫-১০ টাকা বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের এক বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১ ও ২ লিটারের সয়াবিনের বোতল খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। এই সুযোগে কোনো কোনো বিক্রেতা এক লিটারের বোতল ২২০-২৩০ টাকায় বিক্রি করছেন, যদিও বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯০ টাকা।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেল কেজি হিসেবে বিক্রি হয়। গত চার দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে।

গতকাল কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল ১৯৮–২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা চার দিন আগে ছিল ১৯৩–১৯৫ টাকা। গতকাল প্রতি কেজি খোলা পাম তেল বিক্রি হয়েছে ১৭০ টাকায়, যা চার দিন আগে ছিল ১৬৫ টাকা।

ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকটের বিষয়ে কারওয়ান বাজারে দুটি ব্র্যান্ডের তেলের ডিলার মো. ইয়াসিন বলেন, ‘কোম্পানিগুলো থেকে তেলের সরবরাহ কমেছে। কোম্পানি যে তেল দিচ্ছে, আমরা তার পুরোটাই বিক্রি করছি। কোনো মজুত করা হচ্ছে না। কোম্পানি সরবরাহ বাড়ালে আমরাও বেশি বিক্রি করতে পারব।’

তবে দেশের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সংকটের কথা অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিল থেকে তাঁদের সরবরাহ কমেনি। তেলের উৎপাদন ও মজুতও ঠিক আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কোনো প্রভাব এখনো তেলের বাজারে পড়েনি। তাই তাঁদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। খুচরা বাজারে কেন সংকট তৈরি হয়েছে, তা তিনি বলতে পারেননি।

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ তদারকি করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘সরবরাহ সংকটের বিষয়টি আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন