কথোপকথন ফাঁস, মামলায় জামিনের জন্য প্রয়োজন এক কোটি টাকা
![]() |
| গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
আওয়ামী লীগের কারাবন্দী একজন সাবেক রাজনীতিককে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (প্রসিকিউটর)।
মুঠোফোনের বার্তার আদান-প্রদান ও কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। রেকর্ডিংগুলো একটি সংবাদপত্র ও একটি সংবাদমাধ্যম সংগ্রহ করেছে।
রেকর্ডিংগুলোতে চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা মামলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবীদের একজনের কথোপকথন রয়েছে। এই আইনজীবীর নাম মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। জামিনের বিষয়ে তিনি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো এই রেকর্ডিংগুলো যাচাই করে দেখেছে।
ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ—২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম শহরে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন তিনি। রেকর্ড করা কথোপকথনের একটিতে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক সদস্যকে আগের একটি আলোচনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাইমুম রেজা তালুকদারকে বলতে শোনা যায়, শেষ পর্যন্ত তিনি যদি ফজলে করিম চৌধুরীকে বের করতে পারেন—তখন একটি ‘বেশ ভালো অঙ্কের’ টাকার বিষয় থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি ১ কোটির কথা বলেছিলাম।’ ১ কোটি টাকা থেকে সাইমুম রেজা তালুকদার অগ্রিম ১০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্যও বলেন। তিনি বলেন, যদি ১০ লাখের মতো অগ্রিম দেওয়া যায়, তাহলে খুব ভালো হয়—নগদে।
সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি জানার পর তাঁকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান আইনজীবী (চিফ প্রসিকিউটর) তাজুল ইসলাম। তবে ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরানো হয়নি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান আইনজীবী পদে পরিবর্তন আসে। তখন ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে সাইমুম রেজা তালুকদার জানান যে, তিনি আবার মামলাটিতে ফিরে আসবেন।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের একজন সদস্য জানান, এরপর তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে সাইমুম রেজা তালুকদারের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও রেকর্ডিং দেওয়া হয়। এরপর ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন যে, মন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন।
ওই পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা কখনোই ওই আইনজীবীকে টাকা দেননি এবং দেওয়ার ইচ্ছাও ছিল না। বরং তাঁরা তাঁর সঙ্গে কথা চালিয়ে যান যাতে দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়।
সাইমুম রেজা তালুকদার পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইন্টারনেট পরিচালনা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হলেও ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার আগে তাঁর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা খুব কম ছিল।
যোগাযোগ করা হলে সাইমুম রেজা তালুকদার তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এটি সত্য নয়।’ এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি আমি যদি (জামিন পাইয়ে দিতে) চাইতামও, তবে কোনো একক আইনজীবীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। সবকিছু প্রধান আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়... এটি একটি দলগত কাজ।’
সাইমুম রেজা বলেন, তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘আমি কয়েক দিন ধরে পদত্যাগ করার কথা ভাবছিলাম। কারণ, আমি আমার আগের পেশা অর্থাৎ শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করছিলাম।’
সাবেক প্রধান আইনজীবী তাজুল ইসলাম তাঁর সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছেন অথবা তাঁকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন—এমন দাবিও তিনি অস্বীকার করে বলেন, ‘না, আমার এমন কিছু মনে পড়ছে না।’
নতুন আইনমন্ত্রী তাঁকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর হুমকি দিয়েছিলেন—এমন তথ্যও সাইমুম রেজা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে কেবল শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার বিষয়েই কথা বলেছেন। এ বিষয়ে তিনি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এই বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান কোনো মন্তব্য করেননি।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য হয়েছেন ফজলে করিম চৌধুরী। নিজ এলাকায় প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের দমন-পীড়ন করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম শহরে তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুই দিন পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই শহরে আরও দুটি হত্যার ঘটনায়ও ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।'
![]() |
| আদালতে শুনানি শেষে চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে | ফাইল ছবি |
এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়নি। এর বাইরে সাধারণ আইনে করা মামলায় তাঁকে ফৌজদারি আদালতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হয় এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এখন এই আদালতে চলছে।
এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, সাবেক এই সংসদ সদস্যকে আটকের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের এপ্রিলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইমুম রেজা তালুকদার প্রথম তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা জানান, ওই আইনজীবী তাঁদের বলেছিলেন যে, অর্থের বিনিময়ে তিনি ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিশ্চিত করতে পারবেন। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পেতেও তিনি সহায়তা করবেন।
শুরুর দিকের সেই কথোপকথনগুলো রেকর্ড করা হয়নি বলে পরিবারটি জানিয়েছে।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী আলোচনায় সাইমুম রেজা তাঁদের ট্রাইব্যুনালের একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। সাইমুমের দাবি ছিল, ওই কর্মকর্তা ফজলে করিম চৌধুরীর বিচারের দাবি করে আসা 'মুনিরিয়া' নামের একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে ঘুষ নিয়েছেন।
তবে মুনিরিয়া সংগঠনটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাও অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করেছেন।
২০২৫ সালের শেষের দিকে পরিবারটি সাইমুম রেজার সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন রেকর্ড করা শুরু করে বলে জানিয়েছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, সাইমুম রেজা মোট ২৬ বার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এবং নিজে অন্তত ১৪ বার ঘুষ চেয়েছেন।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবার তাঁর জরুরি চিকিৎসা চেয়ে ট্রাইব্যুনালে লিখিত আবেদন করে। আবেদনটি জমা দেওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর সাইমুম রেজা তালুকদার তাঁদের ফোন করেন। পরিবারের ভাষ্যমতে, তিনি জানান যে ইতিমধ্যেই আবেদনের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন তাঁরা আগে থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তিনি ইঙ্গিত দেন, আবেদনটি মঞ্জুর করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে এই ফোনকলটি রেকর্ড করা হয়নি।
ওই দিন সন্ধ্যায় আরেকটি কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। তাতে সাইমুম রেজা তালুকদার আবারও অর্থের বিষয়টি তোলেন। ফজলে করিমের পরিবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি কত টাকা চান। তিনি বলেছিলেন, ‘...শেষ পর্যন্ত যদি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সব মিলিয়ে মানে ওনার ব্যাপারে একটা প্রত্যাশা থাকবে যে এক (১ কোটি টাকা)।’ তিনি এটি কিস্তিতেও হতে পারে বলে জানান, সেটা ১০, ২০ লাখ... যা-ই হোক না কেন।
পরিবারটিকে তিনি এই আলোচনার মাধ্যমে ১ কোটি টাকা এবং ১০ বা ২০ লাখ টাকার কিস্তি বুঝিয়েছিলেন—পরবর্তী কথোপকথনগুলোতে এই বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল।
একই কথোপকথনের সময় সাইমুম রেজা মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ভেতরের সভাগুলো নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে তদন্তকারীরা প্রমাণ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু পুলিশ কিছুই পাচ্ছে না, এখন বড় বড় কয়েকজন দিয়ে ওরা এটা করতে চায়। অবশ্যই তারা তাকে ফাঁসাতে চায়—ফজলে করিম সাহেবকে ফাঁসাতে চায়।’
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ফজলে করিমের পরিবারের সদস্যরা ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান আইনজীবী তাজুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন এবং অর্থ চাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি জানান।
ফজলে করিমের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘আমরা তাঁকে (প্রধান আইনজীবী) এই দুর্নীতি এবং পেশাগত অসদাচরণ সম্পর্কে জানাতে চেয়েছিলাম। একই সঙ্গে আমরা তাঁকে অনুরোধ করতে চেয়েছিলাম যাতে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আমরা চেয়েছিলাম তদন্ত ও পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কোনো পক্ষপাত ছাড়াই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক।’
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ১০ ডিসেম্বরের কথোপকথনের সেই রেকর্ডিংটি তাঁরা তাজুল ইসলামকে শুনিয়েছিলেন, তবে তাঁকে কোনো অনুলিপি দেননি। এরপর সাইমুম রেজাকে ফজলে করিমের মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যদিও তিনি ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী হিসেবে কর্মরত থেকে যান।
এ বিষয়ে সাবেক প্রধান আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যে রেকর্ডিংটির কথা বলা হচ্ছে তা যাচাই করার জন্য এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাকে দেওয়া হয়নি। যদি আমাকে দেওয়া হতো, তবে আমি পদক্ষেপ নিতাম। সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেবলমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে আমি কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতাম না। কোনো প্রমাণই পেশ করা হয়নি। এ ছাড়া আমি আইনজীবীদের নিয়োগদানকারী বা অব্যাহতি দেওয়ার কর্তৃপক্ষও ছিলাম না।’
গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর আবারও ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে ফোন করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি বলেন, ‘প্রধান আইনজীবী বলছিলেন, আমার কাছে অডিও রেকর্ড আছে, এই আছে, সেই আছে। আমি তো একটু অবাক হচ্ছি। হয়তো ধোঁকাও দিয়েছেন।’ তখন ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে সাইমুম রেজা তালুকদার সতর্ক করে বলেন, যেন তাঁরা তাঁদের ফোনের নিরাপত্তা নিয়ে সাবধানে থাকেন।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সাইমুম রেজা তালুকদার সম্ভবত ভেবেছিলেন যে এসব কথোপকথন সরকারি কোনো নজরদারি সংস্থার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে। ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারই যে তা রেকর্ড করেছে, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। এ ধারণার কারণেই টাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান তিনি এবং ফোনের নিরাপত্তার বিষয়টির ওপর জোর দেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সরকার গঠন করে বিএনপি। এর ৯ দিন পর তাজুল ইসলামকে প্রধান আইনজীবীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয় আইনজীবী আমিনুল ইসলামকে।
নতুন প্রধান আইনজীবী নিয়োগের পরদিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে আবার ফোন করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। ফোনে তিনি বলেন, ‘আমি আবার এই মামলাতে যুক্ত হব।’
সাইমুম রেজা ফোনে আরও বলেন, আইনজীবীরা শিগগিরই নথিপত্রগুলো পর্যালোচনা করবেন। ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের পক্ষে তিনি যুক্তি তুলে ধরবেন। প্রধান আইনজীবীকে তাঁর মতো করে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন। তাঁর পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে যেন মামলাটা কঠিন না হয়ে যায় এবং অন্তত ফজলে করিম চৌধুরী যেন জামিন পান।
এসব কথা বলার পর আবার টাকার প্রসঙ্গে ফিরে যান সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো কিছু আইনজীবীদের কানে যাওয়া মানেই হচ্ছে আমার কাজ করার জায়গাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া।’
এরপর আগে যে টাকার অঙ্কের কথা বলেছিলেন, সেটি আবার উল্লেখ করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি বলেন, ‘আপনার (স্বজনকে) শেষবার আমি বলছিলাম যে যদি কাজ হয়, যদি শেষ পর্যন্ত ওনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা যায়, তো তখন আমি, যদি যায়, তাহলে একটা বেশ ভালো অঙ্কের কথাই বলেছিলাম, যে আমি ১ কোটির কথা বলেছিলাম।’
কথা বলার একপর্যায়ে আবার অগ্রিম টাকার বিষয়টি তোলেন সাইমুম রেজা। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আর যদি মনে করেন যে তাঁরা রাজি হন, তাহলে কিছু অংশ এখন শুরুতে দেওয়া যেতে পারে। ...হ্যাঁ, দেশি টাকা। আর এখন সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমাকে অগ্রিম কিছু একটা দেওয়া থাকে, ১০ লাখের মতো যদি অগ্রিম দেওয়া যায়, খুব ভালো হয়—নগদে।’
ট্রাইব্যুনালের নতুন নেতৃত্বে তাঁর প্রভাব বাড়বে বলে উল্লেখ করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা আরেকটা জিনিস, সেটা হচ্ছে ইনশা আল্লাহ আর কয়দিন পর আমার প্রভাব আরও বাড়বে ট্রাইব্যুনালে, কারণ বর্তমান প্রধান আইনজীবী বিএনপিপন্থী, দেখি কী করা যায়।’
এর দুই দিন পর অর্থাৎ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সাইমুম রেজা তালুকদার আবারও ফোন করেন এবং ফজলে করিম চৌধুরীর পক্ষে তদবির করবেন বলে তাঁর পরিবারকে প্রতিশ্রুতি দেন।
কথা বলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাইমুম রেজা তালুকদার আবার ফোন করেন এবং আবারও টাকাপয়সার বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটু সরাসরি বলি, আমি জানি না... আমি কি আসলে আপনাদের থেকে কোনো অংশ এখন চাইব কি না, নাকি একবারে পরে চাইব, কোনটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে? কোনটা হলে ভালো হয়? কাজ হয়ে যাওয়ার পর হলে ভালো হয় না? আগে ফলাফল আসুক তারপরে।’
সাইমুম রেজা তালুকদারের কথা শুনে তখন ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা কীভাবে টাকা দেবেন, সেটা জানতে চান। তখন সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, ‘ওই তো মানে সাধারণ আদালতে (রেগুলার কোর্ট) যখন আসবে, তখন এক ফাঁকে আলাপ হবে। ওই উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট)। তাতে সন্দেহ তৈরি হবে। বুঝাইতে পারছি?’
২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই কয়েকটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে পাঠায় পরিবারটি। এর চার দিন আগে ঘুষ দাবির অভিযোগ সম্পর্কে জানাতে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁরা দেখা করেছিলেন।
এরপর ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের আরেকটি রেকর্ডে সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন যে, মন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনার (স্বজন) সেই অডিও রেকর্ড করে আইনমন্ত্রীকে দিয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন? আইনমন্ত্রী আমাকে এই মাত্র ফোন করেছেন, ফোন করে বলছেন আমাকে পুলিশে দেবেন।’
বর্তমান প্রধান আইনজীবী আমিনুল ইসলাম এই ঘটনার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো তথ্য পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, মন্ত্রী তাঁকে এই বিষয়ে কিছু বলেননি।
প্রধান আইনজীবী জানান, তাঁর জানামতে সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি শিক্ষকতায় ফিরে যেতে চান। উল্লেখ্য, গত সোমবার সাইমুম রেজা তালুকদার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।


Comments
Comments