[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

পাঠকখরা আর হতাশায় শেষ হলো আয়োজন

প্রকাশঃ
অ+ অ-
অমর একুশে বইমেলার শেষ দিন রোববার মেলাপ্রাঙ্গণে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল তুলনামূলক বেশি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

মাসজুড়ে পাঠক খরা কাটিয়ে অবশেষে পর্দা নামল অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর। শেষ দিনের টানে কিছু মানুষ মেলায় এলেও উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। দেশের সবচেয়ে বড় এই বই উৎসবকে ঘিরে প্রতিবার লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকলেও এবার চিত্র ছিল ভিন্ন। যে মেলা প্রতিবছর শেষ দিনে পাঠকদের ভিড়ে মুখর থাকে, এবার সেখানে ছিল কেবলই হতাশার ছাপ। শেষ বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের আনাগোনা কিছুটা বাড়লেও প্রকাশকদের কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ। তাঁদের মতে, প্রত্যাশা আর বাস্তবতার বড় ব্যবধান নিয়েই শেষ হলো এবারের মেলা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—আগামী বছর কি আবার সেই প্রাণবন্ত বইমেলা ফিরে আসবে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের কারণে পিছিয়ে যাওয়া এবারের মেলা ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে শেষ হয়েছে মাত্র ১৮ দিনে। শেষ দিনে দুপুর ২টায় মেলা শুরু হয়ে চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ২৩৬টি। সব মিলিয়ে এবারের মেলায় নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৭টি। অথচ ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৯৯। মেলায় অংশ নেওয়া ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি টাকা, যা গত বছর ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রমজানের মধ্যে মেলা হওয়া, সময় কমে যাওয়া, প্যাভিলিয়ন না থাকা এবং শুরু থেকেই দর্শনার্থী কম আসায় বিক্রিতে বড় প্রভাব পড়েছে।

গতকাল রোববার মেলার মূল মঞ্চে সমাপনী প্রতিবেদন পাঠ করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব সেলিম রেজা। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৬৯টি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮ কোটি টাকা। গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই বিক্রি করেছে। ২০২৪ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৬০ কোটি টাকার এবং ২০২৩ সালে হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার। গত বছর ৭০৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭০-এ। মেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ১৪ মার্চ পর্যন্ত নতুন বই জমা পড়েছে ১ হাজার ৭৭টি। তবে অনেক প্রকাশক বই জমা না দেওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এবার মোট ২৫২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

এবারের মেলার মূল বিষয় ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৬৮টি ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়নি এবং স্টল ভাড়াও নেওয়া হয়নি।

পুরো মেলাজুড়েই ছিল নিরাশার পরিবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান তারিক বলেন, ‘প্রতিবছর ৮-১০ দিন মেলায় আসা হয়, বইও কিনি অনেক। কিন্তু এবার সেই আগ্রহ পাইনি। ভেবেছিলাম শেষ দিন প্রচুর পাঠক আসবেন, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে মেলা মাত্র শুরু হচ্ছে।’

হাওলাদার প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মীরা জানান, বিক্রি নেই বললেই চলে। মাসজুড়ে ক্রেতা খুব একটা আসেননি। অনিন্দ্য প্রকাশের কর্মীরাও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তাঁরা বলেন, অন্যান্য বছর দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকত মেলা প্রাঙ্গণ, কিন্তু এবার মেলা ছিল অনেকটাই নিষ্প্রাণ। বুনন প্রকাশনীর প্রকাশক মো. খালেদ উদ্দিন বলেন, ‘এবার দর্শনার্থী ও বিক্রি—দুটোই খুব কম ছিল। স্টল তৈরির খরচ আর কর্মীদের বেতনই ওঠেনি। অথচ অন্য বছরগুলোতে শেষ দিনেই ১৫ দিনের সমান বিক্রি হতো।’

ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাঈম বলেন, ‘দীর্ঘ ৩২-৩৩ বছরে রোজার মধ্যে মেলা করার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। মেলার দিন কমে যাওয়াটাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া গত এক বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষের হাতে টাকা কম ছিল, যা বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে।’

সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মিলিত অংশগ্রহণে আগামী দিনের বইমেলা নতুন আশা জাগাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এমন একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য থাকবে। উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে ফিরিয়ে নিতে হবে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে।’

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনে মনে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায়ের বোধ তৈরি করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখে, সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মানুষের বই পড়ার অভ্যাসের ওপর। তাই পাঠকদের হাতে ভালো বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত বিভিন্ন স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হয়। চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ‘কথাপ্রকাশ’। মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ‘ঐতিহ্য’, ‘প্রথমা প্রকাশন’ ও ‘দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ‘পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড’। সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ‘সহজ প্রকাশ’। এ ছাড়া শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ‘ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশনস’, ‘মাত্রা প্রকাশ’ ও ‘বেঙ্গল বুকস’।

অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমির ঘোষিত প্রায় ১৮ কোটি টাকার বিক্রির তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছে ‘প্রকাশক ঐক্য’। প্রকাশকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, কিসের ভিত্তিতে রমজান মাসের এই মেলার বিক্রির হিসাব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এই তথ্যের পূর্ণ বিবরণ দাবি করেছেন এবং একে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। প্রকাশক ঐক্যের পক্ষে এই ব্যাখ্যা দাবি করেন মাহরুখ মহিউদ্দিন (ইউপিএল), মুনিরুল হক (অনন্যা), সৈয়দ জাকির হোসাইন (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন), গফুর হোসেন (রিদম প্রকাশনী), এ কে নাছির আহমদ সেলিম (কাকলী), মিলন কান্তি নাথ (অনুপম) ও মাহবুবুর রহমান (আদর্শ) সহ অন্য নেতারা। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন