[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

আলাদা রাখার বালাই নেই, রাজশাহী মেডিকেলে একই ওয়ার্ডে হাম ও অন্য রোগী

প্রকাশঃ
অ+ অ-
শিশুদের হামের চিকিৎসা চলছে গনবেডে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গতকাল | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’-এর লক্ষণ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অসুস্থ অন্য শিশুদের সঙ্গেই রাখা হচ্ছে। হামের লক্ষণ থাকা রোগীদের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানোর কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। ফলে অন্য শিশুদেরও হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এই হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া চার শিশুকে গত বৃহস্পতিবার নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। শুক্রবার সকাল হতে না হতেই দুই শিশু মারা গেছে। চলতি মাসের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে ৮৪ শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য সিরিয়াল দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–এর প্রতিনিধিরা এই হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ১০ জনকে হামে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা পরীক্ষার জন্য আরও নমুনা সংগ্রহ করছেন।

এদিকে রাজশাহীর বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বুধবার ভর্তি হওয়া ২৮ শিশুর মধ্যে ২০ জনের হামের লক্ষণ পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে এবং এতে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি গুরুতর অসুস্থ ৮৪ জন শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তরের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরও নয়টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার চারজন শিশুর জন্য আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এই রোগীরা হলো রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার জান্নাতুল মাওয়া (৮ মাস), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের হুমায়রা বেগম (৭ মাস), শ্রীরামপুর গ্রামের ফারহানা বেগম (৯ মাস) এবং কুষ্টিয়া সদরের হিয়া বেগম (৭ মাস)। সবাইকে হামের রোগী হিসেবে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে শুক্রবার সকাল হতে না হতেই হুমায়রা ও ফারহানা মারা গেছে। জান্নাতুল মাওয়া ও হিয়াকে অন্য রোগীদের সঙ্গেই রাখা হয়েছে।

জান্নাতুল মাওয়ার নানি ফরিদা বেগমের সঙ্গে শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জান্নাতুল মাওয়াকে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের এক নম্বর শয্যায় রাখা হয়েছে। ইনজেকশন দেওয়ার সুবিধার জন্য পর্যায়ক্রমে অন্য শিশুদেরও এই শয্যায় এনে রাখা হচ্ছে।

ফরিদা বেগম এই প্রতিবেদককে চিকিৎসক ভেবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাচ্চাটা খুব গুরুতর অসুস্থ। আপনার হাত-পা ধরি স্যার, আমার বাচ্চাটাকে আইসিইউতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ তাঁর সিরিয়াল নম্বর ২৯। অর্থাৎ তাঁর আগে আরও ২৮ জন রোগী রয়েছে। আর হিয়ার বাবা রিফাত বলেন, ‘আমার মেয়ের অবস্থা খুব খারাপ ভাই। আইসিইউতে বৃহস্পতিবার সিরিয়াল দেওয়া হয়েছে। এখনো ডাকেনি।’ হিয়ার সিরিয়াল নম্বর ৩২।

রাজশাহী মেডিকেলের আইসিইউতে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি শয্যা রয়েছে। সেটিও হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়; সরকারিভাবে নয়।

চলতি মার্চ মাসে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলামকে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর বিশ্বাস ফোনে বলেন, হাম সংক্রামক রোগ। এই রোগের রোগী হাসপাতালে পাওয়া গেলে তাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি সেখানে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন।

শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী নগরের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে সেখানে এমন কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের জহিরের (আড়াই মাস) মৃত্যুসনদে হামের উল্লেখ রয়েছে। তাকেও হাসপাতালে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। যোগাযোগ করা হলে শিশুটির মা জেসমিন খাতুন বলেন, জহিরকে অসুস্থ অন্য শিশুদের সঙ্গে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডেই রাখা হয়েছিল। ভর্তির তিন দিন পর ১৮ মার্চ সকালে সে মারা যায়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১০ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে হাম বলে নিশ্চিত করেছে। অন্য শিশুদের লক্ষণও হামের মতোই। তারা আরও নমুনা সংগ্রহ করছে।

এই রোগীদের আলাদা করে রেখে কেন চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, দুটি আলাদা রাখার ওয়ার্ড রয়েছে। কিন্তু সেখানে শয্যাগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ খুব কম। এ কারণে সাধারণ ওয়ার্ডেই তাদের আলাদা করে রাখতে হচ্ছে। তা ছাড়া ২০০ শয্যার জায়গায় ঈদের আগে ৭০০–এর বেশি রোগী ভর্তি ছিল। রোগী বেশি হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতোই অবস্থা বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই হাসপাতালের পরিচালক বেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বুধবার ভর্তি হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনের হামের লক্ষণ ছিল।

হাম ছোঁয়াচে রোগ—এই রোগীদের আলাদা করে রাখা হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে বেলাল উদ্দিন বলেন, পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সে কারণেই তাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছে।

রাজশাহী সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় হামের লক্ষণ থাকা রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেশি। সিভিল সার্জন এফ আই এম রাজিউল করিম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে সতর্ক আছি। জেলার সব হাসপাতালকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, হামের রোগী পাওয়া গেলে জানাতে হবে। আর এমন রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হবে।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন