[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

আট মাসে কোটিপতি গাড়িচালক, নেপথ্যে সাবেক উপদেষ্টার এপিএস ভাই

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন ও রিয়াজুল ইসলামদের বাড়িতে নতুন ভবন হচ্ছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

একসময় ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন রিয়াজুল ইসলাম। মাস শেষে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার। কিন্তু মাত্র আট মাসে বদলে গেছে তাঁর জীবনের হিসাব-নিকাশ। এখন তিনি দুটি গাড়ির মালিক, ব্যাংকে রয়েছে মোটা অঙ্কের আমানত আর কোটি টাকার ব্যবসায়িক পুঁজি। সব মিলিয়ে আয়কর নথিতে তিনি প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। এর বাইরেও তাঁর নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।

এই নাটকীয় উত্থানের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, রিয়াজুল ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক একান্ত সচিবের (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের আপন বড় ভাই। ভাই নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই যেন ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে তাঁর। এলাকায় রিয়াজুল ইসলামকে সবাই ইলিয়াস মণ্ডল নামে চেনেন।

একজন সাধারণ গাড়িচালক, যিনি আগে কখনো আয়কর দেননি, তিনি প্রথমবারই প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। বিপুল এই সম্পদ অর্জনে সময় লেগেছে মাত্র আট মাস। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব সম্পদ অর্জনের কোনো বৈধ উৎস রিয়াজুল দেখাতে পারেননি।

আয়কর নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ কর বছরে জমা দেওয়া হিসাবে রিয়াজুল ইসলাম ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। নথি অনুযায়ী, এই সম্পদের পুরোটাই তিনি অর্জন করেছেন ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে। এই আট মাসই তাঁর ছোট ভাই মোয়াজ্জেম সাবেক উপদেষ্টার একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।

এ ছাড়া আয়কর নথিতে রিয়াজুল তাঁর ব্যবসায়িক পুঁজি উল্লেখ করেছেন ৯৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। নথিতে দেখা যায়, রাজধানীর শ্যামলী শাখায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসিতে তাঁর ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৮ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে। এই টাকা অর্জনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে গত বছরের ১০ নভেম্বর। এর ঠিক দুই দিন আগে একই হিসাবে একটি সঞ্চয়ী আমানতে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৭ টাকা জমার তথ্য দেন তিনি।

গত বছরের ৩০ জুন রিয়াজুলের হাতে নগদ ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩১ টাকা থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সে তাঁর জমা রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯২ টাকা।

রিয়াজুল ও তাঁর স্ত্রী সাথী খাতুনের নামে থাকা দুটি গাড়ি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। এই দুটি গাড়িই তিনি কিনেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মধ্যে। রিয়াজুল নিজের নামে কেনা মাইক্রোবাসটির দাম দেখিয়েছেন ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। গাড়িটি তিনি কিনেছেন ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর। এ ছাড়া তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা অন্য গাড়িটির দাম দেখানো হয়েছে ১২ লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকা; যা কেনা হয়েছে গত বছরের ৩০ জুন।

মোয়াজ্জেম হোসেনের গ্রামের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়াজুলের বাবা আজিজার মণ্ডল একসময় কৃষিশ্রমিক ছিলেন। মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুরের দহিন পাড়ায় তাঁদের বাড়ি। বাড়িতে একটি টিনের পুরোনো ঘর আর একটি ছোট রান্নাঘর ছাড়া আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছুই নেই।

সেখানে রিয়াজুল ও মোয়াজ্জেমের বাবা আজিজার মণ্ডলের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তাঁর তিন ছেলে ঢাকায় থাকেন এবং তাঁদের রোজগারেই সংসার চলে। তিনি বাড়িতে ছাগল পালন ও কৃষিকাজ করেন। প্রতিবেশীরা জানান, আজিজার মণ্ডল একসময় মানুষের জমিতে কাজ করতেন, কিন্তু বছরখানেক ধরে তাঁদের অবস্থা বদলেছে। ছেলেরা এখন বাড়িতে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে আসেন।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও তাঁর একান্ত সচিব মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ‘শতকোটি’ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আসে দুদকে। এরপর অনুসন্ধান শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে তা মাঝপথে থেমে যায়। এমনকি এই বিষয়ে দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারাও কথা বলছেন না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বৈধ আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের প্রমাণ থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অবৈধ আয়ের পেছনে যদি ক্ষমতার অপব্যবহার বা কোনো যোগসাজশ থাকে, তবে গভীর তদন্তের মাধ্যমে সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার দুইটা গাড়ি আর ব্যাংকের কিছু টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই। থাকলে তো দুদক মামলা করত।’ কোটি টাকার ব্যবসায়িক পুঁজির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, এটি আইনজীবী করেছেন, তিনি বিস্তারিত জানেন না। তাঁর সব মিলিয়ে ৮০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

দুদকের আইন শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের ক্ষেত্রে অপরাধীর পাশাপাশি সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও মামলা করার সুযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০৯ ধারায় দুর্নীতির অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা দানকারীদেরও আসামি করা যায়।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন