চট্টগ্রামে পুলিশি পাহারার মধ্যেই ব্যবসায়ীর বাসায় সন্ত্রাসীদের মুহুর্মুহু গুলি
![]() |
| অস্ত্র হাতে দুই সন্ত্রাসী। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
চট্টগ্রামে পুলিশি পাহারায় থাকা এক ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে সন্ত্রাসীরা। শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় এই গুলির ঘটনা ঘটে। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছে।
এর আগে গত ২ জানুয়ারি ওই বাসায় গুলি করেছিল সন্ত্রাসীরা। সে সময় গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং দরজায়ও গুলি লাগে। এরপর থেকেই বাসাটিতে পুলিশি পাহারা বসানো হয়। পুলিশের পাহারার মধ্যেই আবারও গুলির ঘটনায় আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছেন। প্রথমে ১০ কোটি টাকা এবং পরে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন সাজ্জাদ। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারিও তার বাসায় গুলি করা হয়েছিল। এরপরও টাকা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান সাজ্জাদ। সেখানে লেখা ছিল—‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘সকালে নামাজ পড়ে সবাই যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখন সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ বাসার পেছনের দিক থেকে মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়তে শুরু করে। তারা প্রায় ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করেছে।’ তিনি জানান, ‘নিরাপত্তারক্ষীরা সন্ত্রাসীদের দেখতে পেয়ে বাসায় পাহারায় থাকা পাঁচ থেকে ছয়জন পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি জানান। পুলিশ সদস্যরা বাসার দোতলায় উঠে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে পিস্তল ও চীনা রাইফেলসহ আধুনিক সব অস্ত্র ছিল।’ ঘটনার বিষয়ে মামলা করবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মামলা করে কী হবে? পুলিশ পাহারার মধ্যেই তো তারা গুলি করেছে।’
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। এরপর তারা বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চীনা রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন।
খবর পেয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে হোসাইন কবির ভূঁইয়া জানান, সন্ত্রাসীরা একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে করে ওই এলাকায় আসে। গাড়িটি কিছুটা দূরে রেখে তারা হেঁটে বাসার কাছে গিয়ে গুলি ছোড়ে। এরপর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা সেখান থেকে চলে যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তার লোকজন দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ কর্মকর্তা হোসাইন কবির ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘অস্ত্রধারীরা মুখোশ পরা থাকায় তাদের সহজে চেনা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এই ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ধরার জন্য অভিযান চলছে।’
স্মার্ট গ্রুপ দেশের একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত ২ জানুয়ারি তাদের বাসায় গুলির ঘটনার পরও পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল। তবে সেই ঘটনার পর কোনো মামলা করা হয়নি।
গুলিতে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে সাজ্জাদ আলীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি জানান, ‘গুলি কে করেছে, তা আমি জানি না।’
![]() |
| মুখোশ পরা সন্ত্রাসীদের তিনজন গুলি ছুড়ছেন। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
নগরের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী খান মূলত অপরাধ জগতে পরিচিতি পান ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান খুনের পর। সাক্ষীর অভাবে ওই মামলায় খালাস পেলেও নগরের অপরাধ জগতে তাকে নিয়ে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়।
২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার দাবি, ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাজ্জাদ। একই বছরের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। এরপর থেকেই বিদেশে বসে নিজের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন তিনি। অবশ্য ‘এইট মার্ডার’ মামলা থেকেও সাজ্জাদ খালাস পান।
শুরুতে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে এই বাহিনী গড়ে ওঠে। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান এবং সরোয়ার দল ছাড়েন। গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে সরোয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বড় সাজ্জাদকে দায়ী করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নগর ও জেলার বিশাল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাজ্জাদ ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড (শীর্ষ অপরাধী) তালিকায় আছেন। তালিকা অনুযায়ী তার নাম সাজ্জাদ খান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের এই বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার (অস্ত্রধারী) ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর নেতৃত্বে আসেন ১৫টি মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমন।
এই দলে আরও রয়েছেন খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ। তাদের অধিকাংশেরই অস্ত্র চালনায় বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। বিদেশ থেকে ফোনের মাধ্যমে এই দলটিকে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠান সাজ্জাদ।


Comments
Comments