[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

গাজিপুরে বনের ভেতর আগুন, পুড়ছে লতাগুল্ম, ছুটছে বন্য প্রাণী

প্রকাশঃ
অ+ অ-
গাজীপুরের শ্রীপুরের বিন্দুবাড়ি এলাকায় বনে আগুনের দৃশ্য। গতকাল বুধবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

সবুজ বনের বুক চিরে চলে যাওয়া রেলপথ দিয়ে ধেয়ে চলছে আন্তনগর মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস। ট্রেনটি বন পেরিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসে উড়ছে পোড়া ছাই। বাতাসের তোড়ে আগুনের শিখা যেন আরও দাউ দাউ করে জ্বলছে। আগুনের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে বনের ছোট-বড় নানা প্রাণী ও পাখপাখালি প্রাণপণে ছুটছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিন্দুবাড়ি এলাকায় ভাওয়াল বনাঞ্চলের শালবনঘেঁষা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথসংলগ্ন এলাকায় বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। বনের আগুন এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, একক চেষ্টায় তা নেভানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জ্বলতে জ্বলতে আগুন খুব দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।

বনে আগুনের এই চিত্র শুধু বিন্দুবাড়ি নয়, গাজীপুরের বিভিন্ন বনাঞ্চলেই এখন দেখা যাচ্ছে। এসব আগুনে শাল-গজারি গাছের নিচে জন্ম নেওয়া ছোট চারা (স্থানীয় ভাষায় যা ‘কফিজ’ নামে পরিচিত) পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পুড়ছে ছোট ছোট লতাগুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদ। আগুনের তাপে বনের বিভিন্ন প্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেক প্রাণী আগুনে পুড়ে মারাও যাচ্ছে। মূলত শুকনো পাতার কারণে আগুন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বুধবার বিন্দুবাড়ি এলাকার বন ঘুরে অন্তত পাঁচটি স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। একই দিনে কর্ণপুর, গোসিংগা, বরমী ও খোঁজেখানিসহ আশপাশের আরও সাত থেকে দশটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহে শ্রীপুরের সিমলাপাড়া, মাওনা, বারতোপা ও শিরীষগুড়িসহ বিভিন্ন এলাকার বনেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। আগুন লাগার সময় গুইসাপ, ইঁদুর, বেজি ও শিয়ালসহ নানা প্রাণীকে দৌড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে দেখা যায়। এ সময় বিভিন্ন বন্য পোকামাকড় পুড়ে মারা গেছে এবং ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে পাখিদের দল বেঁধে উড়ে যেতে দেখা গেছে।

শ্রীপুরের বিন্দুবাড়ি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে গাছপালা পুড়ে যাচ্ছে। রেললাইনের পাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। বুধবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন ধ্বংস করে জমি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়। আবার কেউ কেউ পোড়া উদ্ভিদের অংশ সংগ্রহের জন্যও আগুন দেন। অনেক সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জ্বলন্ত সিগারেটের অংশ বনে ফেলে দেওয়ার কারণেও আগুন লাগে। এসব আগুন জ্বলতে জ্বলতে একসময় নিজে থেকেই নিভে যায়, তবে অনেক ক্ষেত্রে দিন-রাত জ্বলতে থাকে। আগুন লোকালয়ের কাছাকাছি চলে এলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই তা নেভানোর চেষ্টা করেন।

রেলপথের পাশে আগুন লাগা নিয়ে স্থানীয় লোকজন জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আগুন রেললাইনের পাটাতন বা স্লিপার পর্যন্ত পৌঁছায় না। পৌঁছালেও অনেক সময় নিজে থেকেই নিভে যায়। তবে আগুনের তীব্রতা বেশি হলে স্লিপারের নিচে থাকা কাঠে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। যদিও বেশির ভাগ স্থানে স্লিপারগুলো পাথরের নিচে ঢাকা থাকে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর রেঞ্জের অধীনে মোট বনভূমির পরিমাণ ২৪ হাজার ২৭১ একর। এই অঞ্চলে একসময় ১০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬ প্রজাতির উভচর, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৩৯ প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব ছিল। বন্য প্রাণীর মধ্যে ছিল গন্ধগোকুল, খ্যাঁকশিয়াল, বাগডাশ, খরগোশ, শজারু, বেজি, কচ্ছপ, শূকর, বানর, কাঠবিড়ালি ও গুইসাপসহ নানা প্রাণী। গত দুই দশকে এসব প্রাণীর বেশির ভাগই বিলুপ্তির পথে। বনাঞ্চলে বারবার আগুন লাগাকে এই সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিন্দুবাড়ি গ্রামের মো. লিয়াকত বলেন, শীতের শেষের দিকে বনে আগুনের ঘটনা বেশি দেখা যায়। বৃষ্টি হলে আগুন নিভে যায়, তবে রোদে মাটি শুকিয়ে গেলে আবারও আগুন জ্বলা শুরু হয়।

মাওনা গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, এভাবে আগুন দেওয়ার ফলে বনের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং নতুন করে জমি দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অথচ এই আগুন নেভাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

বিন্দুবাড়ি এলাকার বন ঘুরে অন্তত পাঁচটি স্থানে গতকাল আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। একই দিন আরও সাত থেকে দশটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

সিমলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, আগুনের পর বিশাল এলাকা ছাইয়ে ঢেকে যায়। এতে অনেক ছোট গাছ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বড় গজারি গাছও মারা যাচ্ছে। এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বন বিভাগের শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান জানান, প্রতিবছরের মতো তাঁরা বনে টহল বাড়িয়েছেন। আগুন যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য প্রতিরোধক রেখা বা ‘ফায়ারলাইন’ তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সচেতন করতে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে এবং মসজিদেও এ বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। অগ্নিনির্বাপক কিছু যন্ত্রও কেনা হয়েছে। বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করে। তবে এই সমস্যা সমাধানে মানুষের সচেতন হওয়া খুব জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ভাওয়াল বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম বড় কারণ হলো বনে আগুন দেওয়া। এতে ছোট কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বড় প্রাণীও মারা যাচ্ছে। অনেক প্রাণী জীবন বাঁচাতে লোকালয়ে চলে এসে মানুষের হাতে মারা পড়ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এগুলো বন্ধ করতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন