[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

শুধু খননেই কি মিলবে সমাধান?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় আজ সোমবার খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

দিনাজপুরের কাহারোলে খাল খননের মধ্য ১৬ মার্চ খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হলো। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি কিলোমিটার খাল খননে ব্যয় হবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, অর্থাৎ পুরো প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, পানি সংরক্ষণ এবং কৃষি ও পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় জলাধার তৈরি করা। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, খাল পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগকে স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়।

তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—শুধু খাল খনন করলেই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব?

অতীতে বিভিন্ন সময় খাল ও ছোট ছোট নদী খননের জন্য বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নদী ও খাল খননের কাজ করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তার সুফল খুব একটা মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খননের কয়েক বছরের মধ্যেই খালগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।

এর কারণ হলো নদী ব্যবস্থার মূল সংকটটি অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের অনেক বড় নদীই এখন নাব্য সমস্যায় ভুগছে। অনেক নদীর উজানে পলি জমে গেছে, কোথাও উৎস এলাকায় পানির প্রবাহ কমে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বড় নদীগুলোতেই পর্যাপ্ত পানি থাকে না। আর বড় নদীগুলো শুকিয়ে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীল ছোট নদী, খাল ও শাখা জলপথগুলোও স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের নদী ও খালগুলো একটি অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খল বা নেটওয়ার্কের মতো। বড় নদী থেকে পানি ছোট নদীতে যায়, সেখান থেকে খালে এবং সবশেষে বিল বা জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। আবার জলাভূমি থেকে পানি ধীরে ধীরে নদীতে ফিরে আসে। এই পুরো প্রাকৃতিক চক্রের কোনো অংশে বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে সমগ্র ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

বর্তমান বাস্তবতায় অনেক জায়গায় ঠিক এটাই ঘটছে। বর্ষাকালে নদী ও খালে পানি দেখা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদী প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে যায়। ফলে ওই নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল খনন করলেও দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা যায় না। বর্ষার পানি দ্রুত বেরিয়ে যায়, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহের উৎস থাকে না।

উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ বাঙালি নদীর কথাই বলা যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করোতোয়া-বাঙালি-ফুলজোড়-হুরাসাগর প্রকল্পের আওতায় ব্যাপক খনন কাজ চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করা। খননের ফলে বর্ষাকালে নদীতে পানির প্রবাহ এখনো দেখা যায়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশ প্রায় শুকিয়ে যায়।

এ অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, শুধু খনন করলেই নদী বা খাল দীর্ঘমেয়াদে জীবন্ত থাকে না। উজান থেকে পানির প্রবাহ না থাকলে এবং পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকলে খনন করা জলপথ দ্রুতই আবার শুকিয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদী ব্যবস্থাপনায় এখন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে শুধু খনন নয় বরং পানি সংরক্ষণ, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাধার তৈরিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ফোর মেজর রিভারস রিস্টোরেশন প্রজেক্ট’। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া এই বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির প্রধান চারটি নদী পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি একটি নিয়ন্ত্রিত জলাধার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এখানে নদীর তলদেশ খননের সঙ্গে সঙ্গে ১৬টি বড় ‘উইয়ার’ বা লো-হেড ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে, যা বর্ষার পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে কৃত্রিম জলাভূমি এবং ছোট-বড় ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে কৃষি ও নগর জীবনের জন্য পানির নতুন উৎস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

শুধু বড় নদী নয়, শহরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায়ও দক্ষিণ কোরিয়া উদ্ভাবনী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিউলের ‘চেওংগিয়েচন পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ যার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। একসময় নগরায়ণের ফলে এই খালটি কংক্রিট দিয়ে ঢেকে তার ওপর উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, যা খালটিকে একটি অদৃশ্য ড্রেনে পরিণত করেছিল। পরবর্তীকালে এই মৃতপ্রায় খালটিকে পুনরুদ্ধার করে সেখানে প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়। পানি শোধন ব্যবস্থা এবং খালের পাশে সবুজ এলাকা তৈরির মাধ্যমে এটি শহুরে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘হানতানগাং ড্যাম’-এর মতো বহুমুখী বাঁধের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও শিল্পে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা নদী ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করেছে।

অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসের পানি ব্যবস্থাপনা থেকেও দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত উন্নয়নের শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচু এই দেশটি শত বছর ধরে পানি নিয়ন্ত্রণের এক অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো ‘জুইডারজি ওয়ার্কস’ । এই প্রকল্পের অধীনে বিশাল ড্যাম ও ডাইক নির্মাণ, সমুদ্রের অংশবিশেষ আটকে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি এবং পাম্পিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করে পোল্ডার তৈরির মাধ্যমে নতুন কৃষিজমি সৃষ্টি করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের পানি ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হলো নদী, খাল, হ্রদ ও সমুদ্রকে আলাদাভাবে না দেখে একটি অবিচ্ছেদ্য ও সমন্বিত জলাধার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা। ফলে তারা একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং পরিবেশ রক্ষার মতো বহুমুখী সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। খাল খনন অবশ্যই দরকার, কারণ বহু খাল দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন বড় নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা, নদীর উজানে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং বর্ষার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা।

নদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা গেলে বর্ষার কিছু পানি ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি বিল ও জলাভূমি সংরক্ষণ করলে সেগুলো প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে শুষ্ক মৌসুমেও নদী ও খালে কিছু পানি থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বাংলাদেশের নদী-খাল-বিল কেবল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়; এগুলো দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই পানি ব্যবস্থাপনার যে কোনো উদ্যোগকে শুধু খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক এবং সমন্বিত পরিকল্পনা।

প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়, শুধু খাল খনন করলেই কি হবে?

এর উত্তর হলো ‘না’। খাল খনন প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা তখনই কার্যকর হবে, যখন নদীর উৎস থেকে শুরু করে খাল, বিল ও জলাভূমি পর্যন্ত পুরো পানি ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা হবে। তখনই হয়তো এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন