সংসদে ৫০ ঘণ্টায় কী আলোচনা করবে বিরোধী দল?
![]() |
| জাতীয় সংসদ অধিবেশন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করে কক্ষ ত্যাগ করলেও সেই ভাষণের ওপরই ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। গত রোববার সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাষণ দিয়েছেন। আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুরা সেই ভাষণ শুনতে চাননি, তাঁরা চলে গিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু সেই ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য তাঁরা ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করার প্রস্তাব করেছেন। যদি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়, তবে সদস্য সংখ্যার অনুপাতে আমরা সময় বরাদ্দ করব। আমরা একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।
বর্জনের পর বিরোধী দলের এই দীর্ঘ আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। রাজনীতিবিদদের কেউ বলছেন, যে ভাষণ বর্জন করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়াটা স্পষ্টতই নিজের অবস্থানের বিপরীত। কারও মতে, আলোচনার প্রস্তাব কে দিয়েছে তা বড় কথা নয়, বরং আলোচনায় কী উঠে আসবে সেটিই আসল। আবার কেউ বলছেন, এটি জাতীয় সংসদের একটি নিয়মিত রীতি। তবে অনেকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর এই দীর্ঘ ৫০ ঘণ্টা আলোচনার পেছনে হওয়া সরকারি ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদ। তিনি জানান, ভাষণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো তুলে ধরা যায় বলেই তাঁদের দলীয় প্রধান এমন সময়ের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন ভিন্ন সুর প্রকাশ করেছেন।
রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, প্রথমত আমরা এই রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই। কারণ জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা আমাদের ছাত্র-জনতাকে হত্যা করলেও রাষ্ট্রপতি কোনো ধরনের ভূমিকা রাখেননি। তিনি ফ্যাসিবাদের অন্যতম সহযোগী। ক্ষমতাসীন বিএনপি সংবিধানের দোহাই দিয়ে তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। ভাষণ নিয়ে সংসদে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব কে দিয়েছে, সেটি বড় কথা নয়। আলোচনায় কী থাকবে সেটিই আসল বিষয়। আমরা মনে করি আলোচনায় তাঁর ভাষণের সমর্থন বা গুণগানের কোনো সুযোগ নেই।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিবাদের দোসর ছিলেন। তাই সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তাঁর ভাষণের সময় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখন কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে তাঁর ভাষণের ওপর আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। আমরা আলোচনায় অংশ নিলেও ফ্যাসিবাদের সব অপকর্ম তুলে ধরব।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ বিষয়টিকে ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যে ভাষণ প্রত্যাখ্যান করা হলো, সেই ভাষণ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দেওয়াটা স্ববিরোধী। বর্তমান রাষ্ট্রপতির কাছেই যখন বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ শপথ নিয়েছিলেন, তখন তিনি ভালো ছিলেন আর এখন খারাপ—এটি আসলে এক ধরনের দ্বিমুখী আচরণ।
বিরোধী দল যে ভাষণের প্রতিবাদে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেছেন, সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হিসাব অনুযায়ী, এতে একেকজন সংসদ সদস্য কথা বলার জন্য ১২ মিনিট করে সময় পাবেন, অর্থাৎ তাঁরা সর্বোচ্চ ১২০০ শব্দ বলতে পারবেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ১১তম সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশনের (২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল) পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংসদীয় কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা খরচ হয়। এর আগে দশম সংসদে (২০১৪-১৮) এই খরচ ছিল প্রতি মিনিটে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
এই হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, যে ভাষণ নিয়ে খোদ সংসদেই আপত্তির ঝড় উঠেছে, তার পেছনে এত সময় ও অর্থের ব্যয় কতটুকু যুক্তিযুক্ত।
তবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, এটি সংসদের দীর্ঘদিনের একটি রীতি। মাসুদ কামালের মতে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে আবার ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া স্ববিরোধিতা হলেও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন তো নিজের কথা বলেননি, তিনি সরকারের কথা বলেছেন। মন্ত্রিসভায় যা পাস হয়েছে, তিনি সেগুলোই পাঠ করেছেন। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী সেসব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে।
শাহাদাত হোসেন সেলিমও জানান, সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি একটি সংসদীয় রীতি। সেখানে শুধু ধন্যবাদ জানানো নয়, বরং সামগ্রিক বিষয়ে সংসদ সদস্যরা আলোচনা করবেন। তাই বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনা ও ধন্যবাদ প্রস্তাব দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই আলোচনায় অংশ নিয়ে সাধারণত সরকারের নীতি, কর্মপরিকল্পনা এবং বিভিন্ন খাতের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

Comments
Comments