জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে আতঙ্ক, সরবরাহ সীমা বেঁধে দিল বিপিসি
![]() |
| রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেল নেওয়ার জন্য লম্বা লাইন। শেরাটন মোড়, শাহবাগ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় জানানো হয়, এখন থেকে একটি মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) ক্ষেত্রে এই সীমা ১০ লিটার।
এ ছাড়া স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা জিপ ও মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল পাবে। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশ্বজুড়ে চলমান সংকটের কারণে মাঝেমধ্যে তেলের আমদানি বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেলের মজুত নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচার হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে ডিলারেরাও আগের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন।
বিপিসি আরও জানায়, কিছু গ্রাহক ও ডিলার ফিলিং স্টেশন থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে অবৈধভাবে মজুত করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
জনগণের আতঙ্ক কমানোর আশ্বাস দিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে আমদানির কাজ সূচি অনুযায়ী চলছে এবং নিয়মিত তেলের চালান দেশে আসছে। পাশাপাশি সারা দেশের ডিপোগুলোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে উঠবে।
ফিলিং স্টেশন থেকে দিনে কোন যানবাহন কতটুকু তেল নিতে পারবে
| যানবাহনের ধরন | জ্বালানি তেলের ব্যবহার | পরিমাণ |
|---|---|---|
| মোটরসাইকেল | অকটেন/পেট্রোল | ২ লিটার |
| প্রাইভেটকার | অকটেন/পেট্রোল | ১০ লিটার |
| এসইউভি/জিপ/মাইক্রোবাস | অকটেন/পেট্রোল | ২০-২৫ লিটার |
| পিকআপ/লোকাল বাস | ডিজেল | ৭০-৮০ লিটার |
| দূরপাল্লার বাস/ট্রাক/অন্যান্য | ডিজেল | ২০০-২২০ লিটার |
ডিলারেরা গ্রাহকের তেলের বরাদ্দ ও ক্রয়ের রসিদ যাচাই করে তেল সরবরাহ করবেন। ফিলিং স্টেশনগুলো তাদের মজুত ও বিক্রির তথ্য তেলের ডিপোতে জমা দিয়ে নতুন করে তেল সংগ্রহ করতে পারবে। ডিলারদের তেল দেওয়ার আগে তাঁদের বর্তমান মজুত ও বরাদ্দের তথ্য যাচাই করা হবে এবং কোনোভাবেই বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে বিপিসি।
এদিকে ছুটির দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পরিবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারের সামনে থেকে শুরু করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
উবারচালক নাজমুল হাসান প্রায় ৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করেছেন। তিনি জানান, শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি অন্তত দুই-তিনটি ট্রিপ দিতে পারতেন। নাজমুল বলেন, ‘প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের অল্প হলেও চলে, কিন্তু তেল ছাড়া আমাদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Comments
Comments