[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

পান চাষে বদলে গেছে শিলখালী, সচ্ছলতার দেখা পেয়েছেন পাহাড়ি জনপদের মানুষ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ক্রেতা–বিক্রেতার উপস্থিতিতে সরগরম পান বাজার। সম্প্রতি পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের কাছারীমোড়া স্টেশনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

ইউনিয়নটির চারপাশে পাহাড়। তিন দশক আগে পর্যন্ত এখানকার বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুরি করতেন বা বন থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে জীবনধারণ করতেন। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। শিলখালীর প্রধান অর্থনীতি এখন পান চাষ।

শিলখালী কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সবচেয়ে ছোট ইউনিয়ন। আয়তন মাত্র ৭.৮৭ বর্গকিলোমিটার। এর অন্তত ৬৫ শতাংশ এলাকা পাহাড়ে ঘেরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় ৩০ বছর ধরে শিলখালীতে পানের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে ৬৭ একর জমিতে পাঁচ শতাধিক পানের বরজ গড়ে উঠেছে। এসব বরজ থেকে বছরে প্রায় ৩১২ মেট্রিক টন পান উৎপাদিত হয়। সরাসরি ৫০০ জন চাষি পান চাষে যুক্ত। এ খাত ঘিরে প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ইউনিয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের আয়ের মূল উৎস এখন পান চাষ। পাশের বারবাকিয়া ও টৈটংয়ের পাহাড়ি এলাকাতেও নতুন করে পান চাষ শুরু হয়েছে।

শিলখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহানারা বেগম (৪৮) একসময় বাঁশ-বেত দিয়ে বিভিন্ন আসবাব বানাতেন। তাতেই সংসার চলত। এখন আর অভাব নেই। তিনি বলেন, ‘একসময় বাঁশ-বেত দিয়ে ঝুড়ি, মোড়া বানিয়ে সংসার চালাতাম। সংসারে অনটন লেগেই থাকত। গত ১০ বছর ধরে পরিবারের সবাই মিলে পান চাষ করছি। এখন অভাব নেই। এক ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আর মেয়ে কলেজে।’

আরেক গৃহবধূ দিলফুরুজ আকতার (৫২) বলেন, ‘আগে বান্দরবানের পাহাড় থেকে ঝাড়ু ফুল এনে ঝাড়ু বানিয়ে বিক্রি করতাম। এখন সেই কাজ ছেড়ে এক একর জমিতে পান চাষ করছি। এতে সংসার ভালোভাবে চলছে।’

স্থানীয় যুবক বেলাল মোহাম্মদ (৩২) বলেন, ‘একসময় বেকার ছিলাম, মাঝে মাঝে বন থেকে গাছ কেটে বিক্রি করতাম। এখন তিন বছর ধরে পান চাষ করছি। এই চাষই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’

শুধু এই তিনজন নন। শিলখালীর বেশির ভাগ পরিবারে পান চাষে এসেছে সচ্ছলতা। এর ওপর ভর করে সন্তানদেরও স্কুল-কলেজে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।

প্রতি সপ্তাহে চাষিরা বরজ থেকে পান তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এসব পান কিনতে আসে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররাও। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতি মঙ্গলবার ইউনিয়নের জারুলবনিয়া স্টেশন এবং শুক্রবার কাছারীমোড়া স্টেশনে পানের হাট বসে। সকাল ছয়টা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা আসেন। এখানে থেকে পানের ঝুড়ি কিনে ছোট ট্রাকে করে বিভিন্ন আড়তে পাঠানো হয়।

পান ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সপ্তাহে এক দিন চট্টগ্রামের আড়তে আমাদের মিষ্টি পান যায়। শিলখালীর পান স্বাদে ভালো, তাই চাহিদাও বেশি।’ পেকুয়া চৌমুহনীর পানের দোকানি নজরুল ইসলাম (৪২) বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৮০০ বিড়া পান কিনি। শিলখালীর পান মিষ্টি এবং তুলনামূলক সস্তা। পেকুয়ার বেশির ভাগ দোকানেই এই পান বিক্রি হয়।’

পানচাষিদের হিসাবে, এক একর জমিতে বরজ করতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। একটি বরজ ১০ থেকে ১২ বছর টিকে থাকে। বীজ লাগানোর এক মাস পর থেকেই সপ্তাহে অন্তত দুবার পান সংগ্রহ করা যায়। রোগবালাই না হলে এক একর জমি থেকে বছরে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার পান উৎপাদন সম্ভব।

চাষিরা জানান, বাজারদর ওঠানামা করে। সাধারণত এক বিড়া পান ১২০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। দুই হাটে সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। এর হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়।

জারুলবনিয়া পানবাজারের উদ্যোক্তা আবদুল হাকিম বলেন, ‘আগে চাষিরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পান বিক্রি করতেন। এখন নির্দিষ্ট বাজার থাকায় পরিবহন খরচ কমেছে এবং লাভ বেড়েছে।’

তবে কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। শিলখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শেখ ফরিদুল আলম বলেন, কাছারীমোড়া স্টেশনের রাস্তার ওপরই পানের হাট বসে, যার কারণে চলাচলে ভোগান্তি হয়। পান বিক্রির জন্য যদি নির্দিষ্ট বাজারের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভালো হতো। তাঁরা এখন সেটি করার চেষ্টা করছেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অপরূপ দে বলেন, ‘আগে পান চাষ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, এখন এটি সম্ভাবনাময় ফসল। কৃষকেরা নিজেই রোগ শনাক্ত করতে পারছেন এবং রোগের প্রতিকারও নিতে সক্ষম হচ্ছেন।’

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘পান চাষের কারণে শিলখালীতে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বেড়েছে। ফলে শিশুরাও বেশি স্কুলমুখী হচ্ছে। উপজেলার মধ্যে এখানেই শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি। এই ইউনিয়নে শিক্ষার হার বর্তমানে প্রায় ৫০ দশমিক ১ শতাংশ।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন